ছয় বছরের রাফিয়ার কাঁধে সংসারের বোঝা, ঝিনুক কুড়িয়ে চলে সংসার
রাফিয়া আক্তার
রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি, হিমছড়ি থেকে
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ২০:২৫ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ২০:৩১
যে বয়সে হাতে থাকার কথা বই-খাতা, পুতুল কিংবা খেলনা, সেই বয়সেই রাফিয়া আক্তারের হাতে উঠেছে সংসারের বোঝা। মাত্র ছয় বছর বয়সেই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হয়ে উঠেছে সে। সকাল হলেই ঘুম থেকে উঠে ছুটে যায় সমুদ্রের তীরে। কুড়িয়ে আনে ঝিনুক ও ছোট ছোট পাথর। সেগুলো দিয়ে মালা বানিয়ে হিমছড়ির পর্যটন এলাকায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে।
পর্যটকদের কাছে মালা নিয়ে শিশুসুলভ সরলতায় রাফিয়া বলে, ‘এটা আপনার জন্য উপহার।’ কেউ ১০ টাকা দেন, কেউ ২০ টাকা। কেউ মালা নেন, কেউ না নিয়েই চলে যান। আবার কেউ মালা না নিয়েও তার হাতে ২০-৫০ টাকা তুলে দেন। তখন রাফিয়ার মুখে ফুটে ওঠে হাসি। সেই হাসির আড়ালে অবশ্য লুকিয়ে আছে অভাব আর হারিয়ে যাওয়া শৈশবের গল্প।
কক্সবাজারের হিমছড়ি ঝর্ণার পাশের আমতলী গ্রামের বিশাল পাহাড়ে ছয়-সাতটি পরিবারের বসবাস। সব মিলিয়ে সেখানে প্রায় ৩০-৩৫ জন মানুষের ছোট্ট বসতি। সেই পাহাড়ের এক কোণে রাফিয়াদের ঘর। ঘর থাকলেও সংসারে স্বচ্ছলতা নেই। নেই বাবার ছায়া, মায়ের কর্মক্ষম হাত। আছে অভাব আর প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যু
রাফিয়ার বাবা আবুল কাশেম ছিলেন ‘চান্দের গাড়ির’ চালক। কক্সবাজার থেকে রাঙামাটিতে পর্যটকদের নিয়ে যাতায়াত করতেন তিনি। তার আয়েই চলত সংসার। ২০২৪ সালের ১২ মার্চ একটি দুর্ঘটনায় সবকিছু বদলে যায়। চান্দের গাড়ির একটি চাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গাড়িটি পাহাড় থেকে নিচে পড়ে যায়। এতে মারা যান আবুল কাশেম। বাবাকে হারিয়ে তখনই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে রাফিয়ার পরিবার।
স্বামীর মৃত্যুর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন রাফিয়ার মা মুর্শিদা আক্তার। পরে ধীরে ধীরে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বর্তমানে তিনি প্রায় কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। অসুস্থতার কারণে সংসারের জন্য কাজ করার সামর্থ্যও নেই তার।
পরিবারের দাবি, বাবার মৃত্যুর পর থেকে তারা কোনো ধরনের সরকারি সহায়তাও পায়নি।
ঝিনুক কুড়িয়ে চলে সংসার
সকাল হলেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে রাফিয়া। কখনো সমুদ্রের তীরে ঝিনুক কুড়ায়, কখনো ছোট পাথর সংগ্রহ করে। সেগুলো দিয়ে মালা বানিয়ে নেয়। এরপর হিমছড়ির পর্যটন এলাকায় গিয়ে মালা বিক্রির চেষ্টা করে।
দিন শেষে কখনো ১০ টাকা, কখনো ২০ টাকা, আবার কোনো দিন ৫০ টাকা নিয়ে পাহাড়ের ঘরে ফেরে সে। ওই সামান্য টাকাই পরিবারের কাছে বড় পাওয়া। সব দিন অবশ্য সমান যায় না। বৃষ্টি বেশি হলে পর্যটকের সংখ্যা কমে যায়। তখন মালাও বিক্রি হয় না, আয়ও হয় না। কখনো কখনো টানা কয়েকদিন খাবার জোটে না।
স্কুলের বদলে দোকানে ভাই
রাফিয়ার ভাই মোহাম্মদ আব্দুর রহিমের বয়স আট বছর। এই বয়সে তার স্কুলে থাকার কথা। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি সে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডিও পেরোতে পারেনি। এখন পাশের একটি দোকানে কাজ করে।
দুই ভাই-বোনের শৈশব যেন একইভাবে দারিদ্র্যের কাছে হার মেনেছে। একজন সমুদ্রের তীরে ঝিনুক কুড়িয়ে মালা বিক্রি করে, অন্যজন দোকানে কাজ করে সংসারে কিছু টাকা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
স্থানীয় বিএনপির কর্মী রাকিবুল হাসান বলেন, পরিবারটি খুবই অসহায়। অনেক কষ্টের মধ্যে তাদের দিন কাটছে। এলাকার বেশির ভাগ মানুষই দরিদ্র হওয়ায় চাইলেও তারা পরিবারটিকে তেমন সহযোগিতা করতে পারেন না।
রাকিবুল হাসান বলেন, ‘মাঝেমধ্যে বছরে এক-দুবার দুই-চার কেজি চাল-ডাল দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু এতে তো আর একটি সংসার চলে না। আমাদের অবস্থাও ভালো নয়। তারপরও পরিবারটিকে দেখে রাখার চেষ্টা করব।’
তিনি বলেন, ‘এতটুকু শিশুকে পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে হিমছড়িতে পর্যটকদের কাছে মালা বিক্রি করতে হয়- এ দৃশ্য সত্যিই কষ্ট দেয়। ওর বয়স তো খেলাধুলা আর স্কুলে যাওয়ার।’
স্থানীয় দোকানদার বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘মেয়েটি প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১২টার দিকে এই পাহাড়ে আসে। এরপর সারাদিন প্রায় না খেয়েই পর্যটকদের পেছনে পেছনে ঘুরতে থাকে। কেউ মায়া করে ১০ টাকা দেন, কেউ ২০ টাকা দেন। আবার কেউ বিরক্ত হয়ে কিছু না দিয়েই তাকে সরিয়ে দেন। কিন্তু তাতেও মেয়েটি থামে না। কারণ, অসুস্থ মা ও ছোট ভাইকে বাঁচিয়ে রাখতে এই সামান্য আয়ই তার একমাত্র ভরসা। মেয়েটির কষ্ট দেখে আমরা অনেক সময় তাকে একটি রুটি ও একটি কলা খেতে দিই। অনেক দিন এটাই হয়ে যায় তার দুপুরের খাবার। অথচ অধিকাংশ দিনই তাকে না খেয়ে থাকতে হয়।’