ভেঙে পড়ল রাবির হাজারো শিক্ষার্থীর স্মৃতিজড়িত কৃষ্ণচূড়া গাছ
ছবি: সমকাল
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:৫৬
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সত্যেন্দ্রনাথ বসু বিজ্ঞান ভবনের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছটি ভেঙে পড়েছে। রোববার রাতে হঠাৎ দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে পড়ে গাছটি। দীর্ঘদিন ধরে যে গাছটির ছায়ায় বসেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা; কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলে মুগ্ধ হয়েছেন। সেই গাছটি ভেঙে পড়ার খবরে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা।
গাছটি ঠিক কবে লাগানো হয়েছিল, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেন না। কারও ধারণা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকেই গাছটি লাগানো হয়েছিল। আবার কেউ মনে করেন, গাছটি প্রাকৃতিকভাবেই জন্মেছিল।
তবে গাছটির বয়স যে অনেক, তা নিয়ে সংশয় নেই। বছরের পর বছর চৈত্রের খটখটে রোদে এর ছায়ায় শরীর জুড়িয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। জ্যৈষ্ঠে সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটে থাকা লাল কৃষ্ণচূড়া ছিল চোখের প্রশান্তি। সময়ের সঙ্গে গাছটি হয়ে উঠেছিল ক্যাম্পাসের অন্যতম পরিচিত স্মৃতিচিহ্ন।
সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘প্রায় সাঁইত্রিশ বছরের স্মৃতি। আজ ভেঙে পড়ল। খুব মিস করব। অসাধারণ সুন্দর ছিল।’
রাবির শিক্ষার্থী মামুনুজ্জামান স্নিগ্ধ বলেন, ‘আমাদের বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে! মানুষ, গাছ, প্রাণ কিংবা প্রকৃতি- কারও প্রতিই হয়তো মায়া রাখতে নেই। স্মৃতিকাতর হই, হৃদয় ভারী হয়ে আসে।’
আইন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী নাইম জাহিন বলেন, ‘ক্যাম্পাসে থাকা অবস্থাতেই প্যারিস রোড তার অর্ধেক সৌন্দর্য হারায়। লকডাউনের সময় এক রাতের প্রবল ঝড়ে অনেকগুলো সুউচ্চ গগনশিরীষ উপড়ে গেল। এরপরে আজ দেখলাম বিজ্ঞান ভবনের সামনের বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছটাও কোনো কারণ ছাড়াই ভেঙে দুই ভাগ! অথচ ভাবতাম, গাছটার আয়ু আমাদের মস্তিষ্কে ক্লান্তি আসার আগ পর্যন্ত ফুরোবে না। আহারে! কত শত স্মৃতি ওই গাছটাকে কেন্দ্র করে।’

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী কামরুল হাসান লিখেছেন, ‘তুমি শতবর্ষী হও বা চিরযৌবনা, একদিন ঠিকই ভেঙে পড়তে হবে। নুইয়ে পড়তে হবে মাটিতে। সকলে আফসোস করলেও মেনে নেবে।’
ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী ইহতেশামুল হক ইবনুর বলেন, ‘ক্যাম্পাসের সবচেয়ে সুন্দর প্রাণ ছিল এটি। সবখানে ঘুরেফিরে এখানে এসেই আটকে যেতাম।’
আরেক শিক্ষার্থী মুবতাসিন ফুয়াদ ধ্রুব লিখেছেন, ‘ক্যাম্পাসের সবচেয়ে প্রিয় শতবর্ষী কৃষ্ণচূড়া গাছটা ভেঙে পড়েছে। এই কৃষ্ণচূড়া গাছকে ঘিরে বর্ষা উৎসব করতে চেয়েছিলাম। এই রাস্তাটা দিয়ে আর হাঁটব কীভাবে? কীভাবে তাকাব এই অনুপস্থিতির দিকে?’
রাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ তোফা লিখেছেন, ‘রাবি সত্যেন্দ্রনাথ বসু একাডেমিক ভবনের সামনে কৃষ্ণচূড়া গাছটির জন্য গোটা ক্যাম্পাস শোকে কাতর হয়ে পড়ল। প্রকৃতির সঙ্গে কতটা মায়া জড়ানো থাকলে গোটা ক্যাম্পাস আজ মলিন!’
গাছটি ভেঙে পড়ার কারণ সম্পর্কে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ এইচ এম মাহবুবুর রহমান বলেন, গাছটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকেই লাগানো হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। দীর্ঘদিনের বয়সের কারণে গাছটির মূল দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
তিনি বলেন, ‘মাটির নিচের মূলগুলোর ওপর নির্ভর করে গাছটি দাঁড়িয়ে থাকলেও এর ওপরের অংশে শাখা-প্রশাখা বেশি বিস্তৃত হওয়ায় গোড়ার পক্ষে অতিরিক্ত ভার বহন করা সম্ভব হয়নি। এ কারণেই গাছটি ভেঙে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।’
এ ছাড়া গাছটির কাণ্ডের ভেতরে পোকামাকড়ের আক্রমণের চিহ্নও দেখা গেছে বলে জানান তিনি।
অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, পরিবেশ ও পরিচর্যার ওপর কৃষ্ণচূড়া গাছের আয়ু অনেকটাই নির্ভর করে। অনুকূল পরিবেশে এবং কাণ্ডে পোকামাকড়ের আক্রমণ না হলে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ শতাধিক বছর, এমনকি প্রায় ১০০ থেকে ২০০ বছর পর্যন্তও বেঁচে থাকতে পারে।
- বিষয় :
- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
- গাছ
- স্মৃতি
- শিক্ষার্থী