ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংযোগ ওলটপালট করে গ্রাহক হয়রানি

সংযোগ ওলটপালট করে গ্রাহক হয়রানি
×

আজু শিকদার, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫৪ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌর জামতলা বাজারে ছোট্ট একটি কনফেকশনারি রয়েছে আবুল কালামের। সেখানে চাও বিক্রি হয়। দোকানের বিপরীতে সড়কের ওপারে নিজের বাড়ি। তাঁর দোকানে ওয়েস্টার্ন জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিভিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) কিছু কর্মী খাবার খেতেন। কিন্তু ঠিকমতো টাকা দিতেন না। এ নিয়ে তর্কাতর্কি করেন কালাম। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বাড়ির আবাসিক সংযোগ বাণিজ্যিক করে দেন ওজোপাডিকো কর্মীরা। বছরখানেক ধরে তাঁকে তিন-চারগুণ বিল গুণতে হচ্ছে। ওজোপাডিকোর এই কার্যালয়ের কর্মীদের বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য অভিযোগ তুলেছেন গ্রাহকেরা। 

গত ২২ জুলাই নিজ দোকানেই কথা হয় আবুল কালামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আগে যেখানে (বাড়িতে) ৬০০-৭০০ টাকা বিল আসতো, এখন আমার বিল আসে তিন হাজার টাকার ওপরে। ৬ মাস আগে নিয়ম অনুযায়ী অ্যাফিডেভিটসহ সকল কাগজপত্র জমা দিয়েছি। অফিসে দফায় দফায় ঘুরেও এখনও পর্যন্ত সংযোগটিকে আবাসিক করতে পারিনি।’

ওজোপাডিকে গোয়ালন্দ অফিসে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলার ভয় দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা আদায়, আবাসিক সংযোগকে বাণিজ্যিক আবার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে আবাসিক সংযোগ, নতুন সংযোগের জন্য বাড়তি টাকা নেওয়াসহ নানা অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতার তথ্য পাওয়া গেছে সমকালের দীর্ঘ অনুসন্ধানে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নতুন গ্রাহকদের তথ্য ও অন্যান্য তথ্য চেয়েও এই প্রতিবেদক দিনের পর দিন ঘুরেছেন কার্যালয়ে। কিন্তু নানা অজুহাত দেখিয়ে শেষে তথ্য দিতে অস্বীকার জানান কার্যালয়ের আবসিক প্রকৌশলীও।

বিদ্যুৎচোর বলে অপমান
উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের নতুনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রেহেনা খাতুন। তাঁর স্বামী আব্দুল কাদের প্রবাসী। সন্তানদের নিয়ে বাড়িতে থাকেন রেহেনা। গত ২২ জুলাই বাড়িতে গেলে দুর্ভোগের কথা জানিয়ে কাঁদতে থাকেন এই গৃহবধূ। তাঁর ভাষ্য, ‘আমার বাড়িতে নিয়মিত যে বিদ্যুৎবিল আসত, তা হঠাৎ করে কিছুটা কমে যায়। বিষয়টি আমি বিলরিডার ও লাইনম্যানদের জানাই। তারা মিটার দেখে বলেন, মিটার ঠিক আছে, সমস্যা নেই।’

মাস ছয়েক আগে হঠাৎ তাঁর মিটার খুলে নেন বিদ্যুৎ বিভাগের লাইনম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ও মাস্টাররোলে কাজ করা মো. সামছু, মো. মজিবরসহ কয়েকজন। তাঁকে অফিসে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়ে তারা চলে যান।

অফিসে যাওয়ার পর রেহেনাকে ‘বিদ্যুৎচোর’ আখ্যা দিয়ে অপমান করা হয়। এ সময় তাঁর মিটারে সমস্যা আছে জানিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে এক লাখ টাকা দাবি করেন কয়েকজন কর্মকর্তা। না দিলে মামলার হুমকি দেওয়া হয়। তিনি কান্নাকাটি করে ৬০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে মামলা থেকে রেহাই পান। বিষয়টি নিয়ে কারও সঙ্গে আলাপ করা যাবে না বলেও তাঁকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। টাকার বিপরীতে কোনো ভাউচার দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে রেহেনা বলেন, ‘না, আমাকে কোনো রসিদ বা কাগজপত্র দেয় নাই।’ বিদ্যুৎবিল কম আসার বিষয়ে তিনি সামছু ও মজিবরকে আগেই জানিয়েছিলেন বলেও জানান।

কয়েকমাস আগে একই রকম ভোগান্তিতে পড়েন দেবগ্রাম ইউনিয়নের পূর্ব তেনাপচা গ্রামের আব্দুল জলিল ফকির। তাঁর বাড়িতে আকস্মিক হানা দিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন জানান, তাঁর বাড়ির মিটারে সমস্যা, তাই বিল কম ওঠে। আব্দুল জলিল অন্য মিটার দিয়ে পরীক্ষা করার কথা বললে বিদ্যুৎকর্মীরা একাধিক মিটার দিয়ে সংযোগ পরীক্ষা করেন। তাঁর মিটার কোনো সমস্যাই ধরা পড়েনি। কিন্তু জলিলের কোনো কথা কানে না তুলেই তারা জানায়, মিটার বিকল, তাই মামলা করা হবে। বিদ্যুৎ কর্মীদের 
দাবির মুখে এক লাখ টাকা ঘুষ দেন তিনি। আরও ১০ হাজার টাকা দেন নতুন প্রিপেইড মিটারের জন্য। তাঁকেও বিষয়টি কাউকে না জানাতে সতর্ক করেন বিদ্যুৎ কর্মীরা। 

খুঁটিতেও ঝুলছে মিটার
বৈদ্যুতিক খুঁটিতে মিটার লাগানোর নিয়ম না থাকলেও গোয়ালন্দ ওজোপাডিকো কার্যালয়ের অদূরেই চোখে পড়ে ভিন্ন চিত্র। ৩০ জুলাই ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে ডাইভারশন এলাকায় খুঁটিতে একটি মিটার নজরে আসে। সেখান থেকে সংযোগের তা অনুসরণ করে দেখা যায়, ফসলি মাঠের মধ্য দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে প্রায় ২ হাজার মিটার দূরের পোলট্রি মুরগির খামারে গেছে সংযোগটি। সেখানে কথা হয় খামারমালিক সুমন মোল্লার সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁর আগে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ ছিল। তখন মাসে তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা বিল আসত। সাত-আট মাস আগে ওজোপাডিকোর সংযোগ নিয়েছেন। এখন মাসে মাত্র ৫০০-৬০০ টাকা বিল দেন। কিন্তু সেই বিল নিজে জমা দেন না, দুই-তিন মাস পর পর বিদ্যুৎ বিভাগের লোক এসে নিয়ে যান। তাঁর কাছে বিলের একটি কাগজ পাওয়া যায়। এতে দেখা গেছে, তাঁর সংযোগটি আবাসিক। অথচ তিনি বাণিজ্যিকভাবেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। 

ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় সংযোগ ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন করলে সুমন মোল্লা বলেন, ‘আমার লাইনটি বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ আছে। তবে দু’এক দিনের মধ্যে বাঁশ দিয়ে উঁচু করে দেব।’

নতুন সংযোগে বাড়তি টাকা
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওজোপাডিকো গোয়ালন্দ অফিস থেকে নতুন সংযোগ দেওয়া হয়েছে ৩৪৮টি। প্রতিটি সংযোগে সরকার নির্ধারিত ফি ২৬০০ থেকে তিন হাজার টাকা। কিন্তু সব সংযোগেই গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি ফিতে গ্রাহক একটি সংযোগও পাননি– এমন তথ্যও মিলেছে। সম্প্রতি সমকালের কথা হয় নতুন সংযোগ নেওয়া গোয়ালন্দ পৌরসভার ইবাদউল্লাহ মিস্ত্রির পাড়ার নয়ন শেখ, উজানচর ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের রেখা খাতুন, ময়ছের মাতুব্বার পাড়ার মো. রবিউল ইসলাম, কাইমদ্দিন মাতুব্বার পাড়ার দেলোয়ার সেকসহ কয়েকজনের সঙ্গে। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, নতুন সংযোগের জন্য তাদের ১০-১১ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে বিদ্যুৎ কর্মীদের। নয়ন শেখ জানান, তাঁর কাছ থেকে টাকা নেন মাস্টাররোলের কর্মী মো. ইলিয়াছ শাহেদ। অন্যরা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সুনির্দিষ্ট নাম জানাতে পারেননি।

এসব বিষয়ে মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এবং মাস্টাররোলের কর্মী মো. সামছু, মো. মজিবরের বক্তব্য জানা যায়নি। ইলিয়াছ শাহেদের দাবি, নয়ন শেখের কাছ থেকে সংযোগ ও মিটার বাবদ আট হাজার টাকা নেন। এর মধ্যে মিটারের দামই সাড়ে ছয় হাজার টাকা।

এসব অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে গত ৩ আগস্ট রাজবাড়ী ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন অর রশিদের কার্যালয়ে যান এই প্রতিবেদক। কিন্তু তিনি কোনো বক্তব্য দিতেই রাজি হননি। তবে ৩০ জুলাই ওজোপাডিকো গোয়ালন্দ কার্যালয়ের আবাসিক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. তোফাজ্জল হোসেন সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, প্রতিটি নতুন সংযোগে নির্ধারিত ফি ২৬০০ টাকা থেকে তিন হাজার টাকা। এর বেশি টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। এ সময় তাঁর বিরুদ্ধেও একই চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগের তথ্য জানালে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো অনিয়মে জড়িত থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে।’
 

আরও পড়ুন

×