ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬

রংপুরে ৪ খুন

রাত থেকেই ছাদে ছিলেন অভিযুক্তরা, হত্যাকাণ্ড ভোরে: পুলিশ কমিশনার

রাত থেকেই ছাদে ছিলেন অভিযুক্তরা, হত্যাকাণ্ড ভোরে: পুলিশ কমিশনার
×

ছবি: সমকাল

মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:১৩ | আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:২০

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিনজনকে হত্যার ঘটনায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন দুই অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তাদের জবানবন্দির বিস্তারিত তুলে ধরেছেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।  

তিনি জানান, ঘটনার দিন ভোরে ছাদে হাঁটাহাটি করতে গিয়ে অভিযুক্ত মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে ইয়াবা সেবন করতে দেখেন গণপতি চক্রবর্তী। এ নিয়ে গণপতি চক্রবর্তী তাদেরকে ধমক দেন। তাদের ইয়াবা সেবনের বিষয়টি যাতে জানাজানি না হয়, তাই তারা গণপতিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। 

এ ঘটনায় ফরেনসিক, ময়নাতদন্ত ও জবানবন্দিতে মা-মেয়ে ধর্ষণের শিকার হননি বলে জানিয়েছে পুলিশ। 

জবানবন্দির সূত্রে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানায়, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস তাদের বন্ধু সীমান্ত দাসের বাড়িতে তিনটি ইয়াবা বড়ি সেবন করেন। পরে ওই রাতেই মোবাইল বন্ধক রেখে ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্ত'র কাছে আরও কয়েকটি ইয়াবা নিয়ে পাশের নির্মাণাধীন ভবন হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন। পরে ভোরে ছাদে হাঁটাহাটি করতে গিয়ে তাদের দেখেন গণপতি চক্রবর্তী। 

তিনি আরও জানান, গণপতি চক্রবর্তীর গলায় থাকা গামছা দিয়েই তাকে হত্যা করেন দুই অভিযুক্ত। এ সময় ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। ধস্তাধস্তির শব্দ পেয়ে ছাদে ওঠেন গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী। এ সময় তারা প্রীতিলতা ও আগামীকে ধরে ফেলেন এবং প্রীতিলতাকে গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে্ন। পরে পাশের কবুতরের দড়ি গলায় পেঁচিয়ে আগামীকে হত্যা করেন। এরপর মরদেহগুলো যাতে দেবুর ছাদ থেকে দেখা না যায়, এ জন্য প্রীতিলতা ও আগামীর লাশ টেনে সিঁড়ির দিকে নিয়ে আসেন। 

পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘‘এসবের মধ্যে ওই বাড়ির ছোট ছেলে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের ঘুম ভেঙে যায়। এ সময় সিদ্ধার্থকে দেখে প্রিয়ম বলে, ‘দাদা, তুমি এখানে কেন?’ এ কথা বলার পরপরই তাকেও হত্যা করেন অভিযুক্তরা।’’

তিনি আরও জানান, চারজনকে হত্যার পর তারা দুজনে গোসল করেন। পরে তারা তাদের কাছে থাকা একটি ইয়াবা সেবন করেন। এ সময় তারা খেজুর ও শসা খান। পরে এই হত্যাকাণ্ডটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে ভাঙচুর করে ও জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখে। এ সময় তারা স্বর্ণের গয়না ও ১৫ হাজার টাকা পাযন। স্বর্ণ আসল না নকল, সেটি পরীক্ষা করেও দেখেন তারা। 

এসব ঘটনার পর বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার সন্দেহে ছাদ থেকে পাওয়া একটি প্লায়ার্স দিয়ে বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরে সুযোগ বুঝে দুপুরের দিকে ছাদ টপকে সেখান থেকে বেরিয়ে যান তারা।

মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ সমাজের মানুষ ছিলেন। আর মাসুয়াপাড়ায় অধিকাংশই দাস জাতের মানুষ বসবাস করতেন। প্রতিবেশী সিদ্ধার্থরাও দাস ছিল। ব্রাহ্মণ সমাজের হওয়ায় তিনি খুব একটা মিশতেন না অন্যদের সঙ্গে। এ ছাড়াও গণপতি চক্রবর্তী বেশি টাকা দিয়ে সিদ্ধার্থ দাসের পরিবারের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে জমি কেনেন।

তিনি জানান, জমি-সংক্রান্ত বা জাতের ভিন্নতার কারণে কোনো ক্ষোভ থেকে হত্যার ঘটেছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, যখন সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস প্রীতিলতা ও আগামী চক্রবর্তীকে হত্যার জন্য গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরেছে, সেই সময়ে চিৎকার করেছিলেন তারা। এই চিৎকার প্রতিবেশীরা শুনলেও বিষয়টি নিয়ে কেউ মুখ খোলেননি। এরই মধ্যে একজন ভদ্রমহিলা চিৎকার শোনার কথা বললেও পরবর্তীতে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয়ে তিনি এ বিষয়ে আর কোনো তথ্য দেননি।

অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষকসহ পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। তারা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের ডোপ টেস্ট করা হবে বলে জানিয়েছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ টেস্ট করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।

এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের বন্ধু সীমান্ত দাস ও শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের সাক্ষ্যগ্রহণ আদালতের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। দুজনের সাক্ষ্যের সঙ্গে গ্রেপ্তার অভিযুক্ত মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের বক্তব্যে মিল রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার। 

সংশ্লিষ্ট খবর

আরও পড়ুন

×