রংপুরে চার খুন
‘পরিবারের বাতি জ্বালানোরও কেউ রইল না’
শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাদের দুই সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ তাদের বাড়ি থেকে উদ্ধার করে পুলিশ
পীরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ২২:৪০
রংপুর জিলা স্কুলের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিজ বাড়িতে খুন হয়েছেন। পরিবারটিতে আর কেউ রইল না। গত শনিবার রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়ার বাড়ি থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ বলছে, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়া একে একে চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর পর ওই বাসায় কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে খুনিরা। এ সময় তারা গোসল করে এবং খেজুর ও শসা খায়। জড়িত সন্দেহে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নিহত চারজন হলেন– গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), তাদের মেয়ে স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।
খোঁজখবর নেওয়ার জন্য গতকাল শনিবার রাতে প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে ফোন করেছিলেন তার বোন পূজা চক্রবর্তী। ফোন বন্ধ পেয়ে একে একে বোনের স্বামী, তাদের মেয়ে এবং ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। সবারই ফোন বন্ধ পান।
এর পর নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কামাল কাছনার মাছুয়াপাড়ায় বোনের বাসায় যান। নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির দোতলার কাজ শেষ করেছেন। তিনতলায় শুধু ছাদ দেওয়া হয়েছে। নিচতলাও ফাঁকা।
পূজা চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্বামীকে নিয়ে আসলাম। তখন দিদির বাড়ির প্রধান ফটক বন্ধ ছিল। কলিং বেলে চাপ দিলাম, বাজে না। পুরো বাড়ি অন্ধকার। দিদি, দিদি, আগামী (প্রার্থী), প্রিয়ম বলে ডাকতে থাকি। কয়েক প্রতিবেশী ছুটে আসে। পরে পাশের বাড়ির মাঝের ছোট্ট প্রাচীর টপকে ভেতরে ঢুকলাম।’
স্বজনদের মরদেহ দেখার ভয়ানক সেই অভিজ্ঞতার বিষয়ে পূজা বলেন, ‘আমার ভাগনের লাশ ছিল খাটের নিচে। আমার বড় বোনকে মেরে তিনতলায় ওঠার সিঁড়িতে ফেলে রাখছে। তার ওপর ভাগনির লাশ ফেলে রাখছে। জামাই বাবুর লাশ ছিল তিনতলার ছাদে। উনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। অনেক কষ্ট করে বাড়িটা করছেন। খুব শান্ত মানুষ। এমন মানুষটারে মেরে ফেলল! পরিবারের সবাইরে মেরে ফেলল। এই পরিবারের তো বাতি জ্বালানোরও কেউ রইল না। আমরা চাই, এর সুষ্ঠু বিচার হোক। কঠিন শাস্তি হোক।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, গণপতি সম্প্রতি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ওই বাড়িতে থাকা শুরু করেন। তারা নতুন এসেছেন বলে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠেনি। শনিবার রাতে প্রীতিলতার বোন পূজা ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ডাকে। ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা প্রধান ফটক ও দরজা ভেঙে ঘরের ভেতরে ঢোকেন। এর পর একে একে চারটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
রাতভর ঘটনাস্থলে ছিল গোয়েন্দা পুলিশ, সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকটি দল।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী বলছেন, ‘বৃহস্পতিবার অথবা শুক্রবারের কোনো একসময় তাদের খুন করা হয় বলে আমরা ধারণা করছি। তাদের গলায় দড়ি ও গামছা প্যাঁচানো রয়েছে। শ্বাসরোধ করে তাদের হত্যা করা হয়।’
এদিকে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে রংপুর জিলা স্কুল ও কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা রোববার দুপুরে মানববন্ধনসহ প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।
- বিষয় :
- রংপুর
- হত্যা
- পুলিশ
- স্কুলশিক্ষককে হত্যা