ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

মক্কা চুক্তি, সৌদি সফরের আমন্ত্রণ এবং বাংলাদেশের সমীকরণ 

মক্কা চুক্তি, সৌদি সফরের আমন্ত্রণ এবং বাংলাদেশের সমীকরণ 
×

গত ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে।

খন্দকার মো. মাহফুজুল হক

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:২২

পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ঘিরে পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন এক নিরাপত্তা সমীকরণের আলোচনা শুরু হয়েছে। চুক্তিটিকে ইতোমধ্যে কেউ কেউ সম্ভাব্য ‘ইসলামি ন্যাটো’র সূচনা হিসেবে অভিহিত করছেন। যদিও একে এখনই পূর্ণাঙ্গ কোনো ইসলামি সামরিক জোট বলা অতিরঞ্জিত হবে, তবু চুক্তিটির সম্ভাব্য বিস্তার এবং এর সঙ্গে বাংলাদেশের নাম যুক্ত হওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করার মতো নয়।

এরই মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ১৭ আগস্ট ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফের এইচ. বিন আবিয়াহ প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমন্ত্রণপত্রটি হস্তান্তর করেন। সৌদি পক্ষ জানিয়েছে, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করা হবে। এই আমন্ত্রণের সময়টিও বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

কারণ গত ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তিতে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও সামরিক সমন্বয়, স্থল, নৌ, আকাশ ও সাইবার ক্ষেত্রে যৌথ সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও শিল্পে সহযোগিতার বিষয় রয়েছে। তুরস্ক এটিকে ভবিষ্যতে সম্প্রসারণযোগ্য একটি কাঠামো হিসেবেও দেখছে।

দ্য সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই প্রতিরক্ষা চুক্তি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আদর্শিক সামরিক জোটে পরিণত হতে পারে এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত এর প্রভাব বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও বিশ্লেষণটি একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছে যে মুসলিম দেশগুলোর জাতীয় স্বার্থগত পার্থক্য এখনও অনেক বেশি; ফলে একে ন্যাটোর আদলে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট হিসেবে বিবেচনা করার সময় এখনও আসেনি।

তবে এই নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর সম্ভাব্য সম্প্রসারণ। তুরস্কের পক্ষ থেকে মিসরের মতো অন্য দেশগুলোর সম্ভাব্য অংশগ্রহণের কথাও আলোচনায় এসেছে। অর্থাৎ এটি শুধু সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যকার একটি সীমিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হয়ে থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা কাঠামোতে পরিণত হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বাংলাদেশের নাম এই আলোচনায় আসার পেছনে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বাংলাদেশের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ক্রমশ গভীর হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের কাছ থেকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। দ্য সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টও বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নের প্রসঙ্গে পাকিস্তান ও চীনের যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের সম্ভাব্য ক্রয়ের বিষয়টি উল্লেখ করেছে।

তা ছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন মাত্রা পাচ্ছে। বিশেষভাবে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, সৌদি যুবরাজের আমন্ত্রণটি কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সফরের জন্য নয়। আমন্ত্রণের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে পরামর্শ করতে চায়। এখান থেকে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠতে পারে যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য রিয়াদ সফরে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কিংবা বৃহত্তর মুসলিম নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আলোচনা হতে পারে কিনা? তবে সম্ভাবনা অমূলক বলার কারণ নেই। একদিকে সৌদি আরব নিজেই নতুন একটি বহুপক্ষীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর কেন্দ্রীয় অংশীদার; অন্যদিকে বাংলাদেশকে সেই কাঠামোর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অংশগ্রহণকারী হিসেবে তুরস্কের একটি সংবাদমাধ্যমে আলোচনা করা হয়েছে। এর ওপর সৌদি নেতৃত্ব এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে সরাসরি পরামর্শ করতে চাইছে।

যদিও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের সম্ভাব্য উদ্বেগ গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার আলোকে দেখতে হবে। দেশের বর্তমান প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে ভারত সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গত দুই দশকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিষয়ে ভারতের প্রকাশ্য প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এবং অনেক ক্ষেত্রে দিল্লির ‘দাদাগিরি’সুলভ আচরণের ধারণা এই মনোভাবকে আরও জোরালো করেছে। ফলে বাংলাদেশের মানুষের একটি অংশের কাছে ভারত এখন শুধু একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে চাওয়া শক্তি হিসেবেও বিবেচিত হয়। এই বাস্তবতায় মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির মতো কোনো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোয় বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন কৌশলগত উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা হতে পারে, তেমনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও এর প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে। প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক বা কৌশলগত চাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশের পাশে একাধিক শক্তিশালী এবং মুসলিম রাষ্ট্রের সমর্থন থাকার মতো একটি নিরাপত্তা কাঠামোকে দেশের জনমতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্বাভাবিকভাবে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন রিয়াদ সফর এ প্রক্রিয়ায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। যদিও এই মুহূর্তে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বিশ্লেষণ হলো, বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই; কিন্তু বাংলাদেশকে ঘিরে নতুন একটি কৌশলগত সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের আমন্ত্রণ, তুরস্কের গণমাধ্যমে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার আলোচনা এবং পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের বাড়তে থাকা প্রতিরক্ষা যোগাযোগ– এই তিনটি প্রবণতা ভবিষ্যতে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য রিয়াদ সফর নিছক একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহায়তার বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক একটি বৃহত্তর কৌশলগত মাত্রা পাবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। 

খন্দকার মো. মাহফুজুল হক: মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক
 

আরও পড়ুন

×