এক বছরের সড়ক সংস্কারের কাজ দুই বছরেও শুরু হয়নি
বিগত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কমলগঞ্জের নৈনারপার বাজার-ইসলামপুর ইউপি অফিস হয়ে কাঁঠালকান্দি বিওপি ক্যাম্প অফিসমুখী সড়কের একাংশ। বৃহস্পতিবার তোলা সমকাল
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার নৈনপার বাজার-ইসলামপুর ইউপি অফিস হয়ে কাঁঠালকান্দি বিওপি ক্যাম্প সড়কের মেরামত কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৫ সালের জুন মাসে। অথচ এখন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের নির্ধারিত সংস্কারের কাজ শুরু করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, উপজেলা প্রকৌশল দপ্তর থেকে এ বিষয়ে একাধিক তাগিদপত্র দেওয়া হয়েছে। তা আমলে নিচ্ছেন না ঠিকাদার। ফলে একদিকে যেমন সড়কটির সংস্কার কাজ আটকে গেছে; অন্যদিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জনভোগান্তি বাড়ছে।
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত সংস্কারহীন সড়কটিতে পিচ উঠে গিয়ে খানাখন্দ দ্বিগুণ হারে বাড়ছে এবং অসংখ্য ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রতিদিন যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় অধিবাসী ও পথচারীরা। দ্রুত এ সড়কের কাজ শুরুর জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, বন্যা ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ রাস্তার অবকাঠামো সংস্কার প্রকল্পের আওতায় মৌলভীবাজার জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে এক প্যাকেজে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চারটি সড়কের সংস্কারের কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। যার ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৪ কোটি টাকা। দরপত্রভুক্ত সড়কের মধ্যে রয়েছে কমলগঞ্জ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ চৈত্রঘাট-নয়াবাজার ভায়া শহীদনগরের চার কিলোমিটার সড়ক এবং নৈনপার বাজার-ইসলামপুর ইউপি অফিস ভায়া কাঁঠালকান্দির দেড় কিলোমিটার বিওপি ক্যাম্প সড়ক। দুটি সড়ক মেরামত কাজের সমন্বিত প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য কুলাউড়ার মো. মুহিবুর রহমান ও আরএবিআরসি (প্রাইভেট) লিমিটেড (জেভি) ঠিকাদার নির্বাচিত হন।
২০২৪ সালের ২ এপ্রিল কার্যাদেশ পাওয়ার পর ২০২৫ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজটি বাস্তবায়ন করার নির্ধারিত সময় ছিল। ঠিকাদার মুহিবুর রহমান কোকিল প্রথম সড়কটির (চৈত্রঘাট-নয়াবাজার) কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করলেও নৈনপার বাজার-ইসলামপুর সড়কটির কাজ গত দুই বছরেও শুরু করেননি।
দরপত্র প্রাপ্তির ৫ মাস পার হলেও কাজ শুরু না করায় ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর কমলগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে তাগিদপত্র পাঠানো হয়। লিখিত তাগিদ দিলেও কাজ বাস্তবায়নে তিনি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। ফলে দুই বছর আগের ছোট ছোট ভাঙন এখন বিশাল আকারের গর্তে পরিণত হয়েছে।
সড়কটিতে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে সড়কের পিচ উঠে পাথর ও মাটি বের হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই গর্তে পানি জমে কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায়। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) কাঁঠালকান্দি বিওপি ক্যাম্পের যাতায়াতসহ সীমান্ত এলাকার হাজার হাজার মানুষের মূল ভরসা এই সড়ক। বর্তমানে সড়কটি দিয়ে অত্যন্ত কষ্ট করে যানবাহন চলাচল করছে। বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় খানাখন্দ সৃষ্টির পাশাপাশি রাস্তার পাশ ভেঙে পড়েছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহন দ্রুত চলাচল করতে পারছে না।
স্থানীয় নৈনপারের বাসিন্দা ফয়সল আহমেদ ও বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কবির আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুই বছর আগে সংস্কার কাজ শুরু হওয়ার কথা শুনে আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু ঠিকাদার ও দপ্তরের গাফিলতিতে এই সড়কের মরণদশা। ঠিকাদারের এ রকম স্বেচ্ছাচারিতা ও অবহেলা মেনে নেওয়ার মতো নয়।
নিয়মিত এই রুটে যান চালান চালক জুমেল মিয়া, আব্দুল কাইয়ুম ও বাদল বলেন, ভাঙা সড়কের কারণে প্রায় প্রতিদিনই গাড়ি নষ্ট হয়, চাকা পাংচার হয়। রোগী বা গর্ভবতী মায়েদের এই রাস্তায় নিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
নৈনপার বাজারের ব্যবসায়ী আলিম উদ্দিন জানান, সড়কটির অবস্থা খুবই খারাপ। দুই বছর আগে সড়কটি যে ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল, তা বর্তমানে দ্বিগুণ বেড়েছে। নতুন করে বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে গেছে।
স্থানীয় সমাজকর্মী দীপু আহমেদ রাসেল বলেন, কমলগঞ্জের দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি দুই বছর ধরে খানাখন্দে ভরপুর। ফলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্কুলশিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলজিইডির সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ঠিকাদার মুহিবুর রহমান কোকিল অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁর বাড়ি কুলাউড়ায়। এলজিইডি ও সড়ক বিভাগের কয়েক কোটি টাকার কাজ মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান থাকা এবং উচ্চমহলে যোগাযোগ ভালো থাকায় তিনি স্থানীয় অফিসের তাগিদকে কোনো পাত্তাই দিচ্ছেন না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার মুহিবুর রহমান কোকিল বলেন, প্রথম সড়কের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা হয়েছে। তবে নৈনপার অংশের বিটুমিন ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং পারিপার্শ্বিক কিছু জটিলতার কারণে কাজ শুরু করতে কিছুটা দেরি হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেখানে সরঞ্জাম পাঠিয়ে কাজ শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কমলগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী সাইফুর আজম সড়কটির কাজ শুরু না হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, অফিস থেকে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি দ্রুত কাজ শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন।
- বিষয় :
- সড়ক