ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে কষ্ট পেয়েছি’

‘নিখোঁজ’ মিরাজ শেখের বোন বললেন

‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে কষ্ট পেয়েছি’
×

মিরাজ শেখ

বাগেরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৪৩

বাগেরহাটের মোংলার মিরাজ শেখকে ‘গুমের’ অভিযোগ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যকে ‘অপ্রত্যাশিত’ বলেছেন ভুক্তভোগীর বোন লিজা ইসলাম। পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগও করেছেন তিনি।

গত শনিবার রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিরাজ শেখের ঘটনা নিয়ে স্বাধীনভাবে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে বনদস্যুদের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি এসেছে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে কোনো গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুষ্ঠানে আরও বলেন, ‘মিরাজ শেখের রেকর্ডও সেই রকম। তাঁর বাবা ও দাদার রেকর্ডও একই রকম। এ বিষয়ে এর বেশি বিস্তারিত আর বলতে চাই না।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মিরাজ শেখের বোন লিজা ইসলাম গতকাল রোববার সমকালকে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্য অপ্রত্যাশিত। আমাদের উপস্থিতিতে তিনি যে ধরনের কথা বলেছেন, আমরা কষ্ট পেয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘এর আগে আমরা বিভিন্ন সময় থানায় কথা বলেছি; কিন্তু তখন কোনো মামলার কথা শুনিনি। এখন শুনছি, একাধিক মামলা রয়েছে। তাহলে কি মামলাগুলো ব্যাকডেটে (আগের তারিখে) দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তারা বলছে, ঘটনার দিন সন্ধ্যা থেকে আমার ভাইয়ের ফোন বন্ধ ছিল; কিন্তু মাঝরাত পর্যন্ত আমরা ফোন খোলা পেয়েছি। কল ঢুকেছে, মেসেজও সিন হয়েছে। সেই ফোনের সূত্র ধরেও তো তার অবস্থান বের করা যেত?’ ভয়ভীতি দেখিয়ে সব সাক্ষী বদলে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

লিজা আরও বলেন, ‘আমার ভাই যেখানে গুমের শিকার হয়েছে, সে কথা না বলে এখন আমার বাবা-দাদার কথা টেনে আনা হচ্ছে। আমরা ভুক্তভোগী। কিন্তু আমাদের পাশে না থেকে অনবরত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাহলে আমরা কোথায় যাব? ঘটনা না জেনেই আমার বাবা বনদস্যু ছিল বলা হচ্ছে। তিনি মূলত জেলে ছিলেন। একদিন তাঁকে আটক করে দস্যুরা মুক্তিপণ চায়। টাকা দিতে না পারায় তাঁকে দুই মাস আটকে রেখে বাবুর্চির কাজ করায় দস্যুরা। একসময় তিনি পালিয়ে আসেন। কিন্তু নাম হয়ে যায় তিনি দস্যুদলের সদস্য। পরে তো আত্মসমর্পণও করেছেন।’

মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী হারিয়ে গেছে। সন্তান নিয়ে প্রায় পাঁচ মাস ধরে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ভয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। খেয়ে-না খেয়ে দিন কাটাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘কোস্টগার্ডের সবার বিরুদ্ধে তো আমরা অভিযোগ করিনি; যারা জড়িত, তাদের কথা বলেছি। স্বামীকে খুঁজতে গিয়ে জেলও খেটেছি। কোস্টগার্ড তখন বলেছে, দু-তিন দিনের মধ্যে ছেড়ে দেবে। আমার স্বামী যদি অপরাধী হয় তাকে জেল দিক, যাবজ্জীবন দিক। আমার সন্তান জেলে গিয়ে ওর বাবাকে দেখবে। তবু আমার স্বামীকে তারা ফেরত দিক।’

৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বিগত সময়ে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে বা তাদের সন্ধান পেতে চাই আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং মানবাধিকার’ শিরোনামে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মিরাজ শেখ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘গুমের কাহিনি’ সাজানোর চেষ্টা হতে পারে। তিনি বলেন, দস্যুরা নদীর তীরে একটি পন্টুন রেখেছিল। ওই পন্টুন ব্যবহার করে জলদস্যুদের জন্য সমুদ্র থেকে রসদ সংগ্রহ ও সরবরাহ করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। কোস্টগার্ড পন্টুনটি সরিয়ে দেওয়ার পর এ নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। ওই ঘটনার জেরে কোস্টগার্ডের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পন্টুন অপসারণকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের পাশাপাশি মিরাজ শেখকে কোস্টগার্ড নিয়ে গেছে– এমন অভিযোগও সামনে আনা হয়। তবে বিষয়টি জলদস্যুদের পরস্পরবিরোধী গ্রুপগুলোর সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

গত ১০ এপ্রিল বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জয়মণীর ঘোল এলাকা থেকে নিখোঁজ হন স্থানীয় জেলে মিরাজ শেখ।

আরও পড়ুন

×