দশ বছরের সঞ্চয় কৌটায়, সব টাকা খেল পোকায়
পোকায় কাটা নোটগুলো নিয়ে বসে আছেন মনোয়ারা বেগম
নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২১:৪৩
জীবনের শেষ সম্বলটুকু এভাবে হারাতে হবে, তা কল্পনাও করেননি মনোয়ারা বেগম। স্বামীর সঙ্গে প্রায় ১০ বছর ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়েছিলেন। সেই সঞ্চয় থেকে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ভবিষ্যতের বিপদের কথা ভেবে খুচরা টাকা জমিয়ে একসময় সঞ্চয় দাঁড়ায় প্রায় দুই লাখ টাকা। নিরাপদ মনে করে টাকাগুলো রাখা হয়েছিল জর্দার একটি কৌটায়। কিন্তু প্রয়োজনের সময় কৌটা খুলে দেখা গেল, দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় পোকায় কেটে নষ্ট করে দিয়েছে সব নোট।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌরশহরের পুরাতন জেলখানা রোডসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম এখন স্বামীহারা। জীবিকার অন্যতম অবলম্বন ভোগাই নদী থেকেও আগের মতো বালু-পাথর পাওয়া যায় না। ফলে আয়ও বন্ধ। এর মধ্যে দীর্ঘদিনের কষ্টের সঞ্চয় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।
মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী মারা গেছে তিন মাস হইলো। অনেক কষ্টে দুইটা মেয়েরে বিয়ে দিছি। আগে ভোগাই নদী থাইকা পাথর তুইলা বিক্রি কইরা দিন চালাইতাম। অহন তো নদীতে পাথরও নাই। আল্লাহ আমার শেষ সম্বলটারেও এভাবে নষ্ট কইরা দিল। অহন তো আমার আর কোনো পথ নাই।’
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনোয়ারা ভোগাই নদী থেকে বালু-পাথর তুলে বিক্রি করতেন। তাঁর স্বামী জিয়া উদ্দীন ছিলেন মিষ্টি তৈরির কারিগর। দুজনের কষ্টের উপার্জনেই চলত তাঁদের সংসার। সংসারের খরচ মেটানোর পরও ভবিষ্যতের কথা ভেবে অল্প অল্প করে টাকা জমাতেন তাঁরা।
প্রায় ১০ বছর ধরে এভাবে সঞ্চয় করতে করতে আট মাস আগে তাঁদের জমানো টাকা প্রায় দুই লাখে দাঁড়ায়। খুচরা টাকা জমিয়ে পরে এক হাজার টাকার নোট সংগ্রহ করতেন তাঁরা। সব টাকা একটি জর্দার কৌটায় রেখে দেন মনোয়ারা।
এরপর প্রায় তিন মাস আগে মারা যান জিয়া উদ্দীন। তাঁর মৃত্যুর পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে মনোয়ারার ওপর। কিন্তু জীবিকার অন্যতম অবলম্বন ভোগাই নদী থেকেও আগের মতো বালু-পাথর পাওয়া যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে তাঁর আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।
সম্প্রতি টাকার প্রয়োজন হলে জর্দার কৌটাটি বের করেন মনোয়ারা। কৌটার মুখ খুলতে না পেরে সেটি কেটে ফেলেন তিনি। এরপর ভেতরের টাকার অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে যান। দীর্ঘদিন কৌটায় পড়ে থাকায় টাকার নোটগুলো পোকায় কেটে ঝাঁঝরা করে ফেলেছে। কোনো কোনো নোট আবার টুকরা টুকরা হয়ে গেছে।
মনোয়ারা বলেন, ‘এই টাকাডা আছিল আমার শেষ সম্বল। স্বামী নাই, কামকাজও নাই। মেয়েদের বিয়ে দিছি অনেক কষ্টে। দশ বছর ধরে একটু একটু কইরা টাকা জমাইছি। ভাবছিলাম, বিপদের সময় এই টাকাডা কাজে লাগামু। অহন সব শেষ হইয়া গেল। অহন আমি কী করমু?’
স্থানীয় বাসিন্দা মিলন শেখ বলেন, মনোয়ারা ও তাঁর স্বামী জিয়া উদ্দীন দীর্ঘদিন অনেক কষ্ট করে সংসার চালিয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর মনোয়ারা একাই অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে দীর্ঘদিনের জমানো টাকাও নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনা খুবই কষ্টদায়ক।
নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল মালেক বলেন, মনোয়ারা বেগমের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় নষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার সুযোগ আছে কি না, তা দেখা হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি এড়াতে নগদ টাকা দীর্ঘদিন কৌটায় বা অনিরাপদ স্থানে না রেখে ব্যাংক বা নিরাপদ কোনো মাধ্যমে সংরক্ষণের পরামর্শ দেন তিনি।