ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার লড়াই
সিরাজদীখান উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের মধুপুর মনিপাড়ায় বাঁশ-বেত শিল্পের কাজ করছেন কারিগররা। সম্প্রতি তোলা ছবি: সমকাল
ইমতিয়াজ বাবুল, সিরাজদীখান (মুন্সীগঞ্জ)
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:০৬
আধুনিকতার ছোঁয়ায় একে একে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্য। প্রযুক্তিগত পণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কুলিয়ে উঠতে না পেরে পেশা বদল করছেন অনেকে। তবে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও বংশপরম্পরায় বাঁশ ও বেত শিল্প ধরে রাখার চেষ্টা করছে সিরাজদীখান উপজেলার প্রায় একশ পরিবার। তাদের বাস রাজানগর ইউনিয়নের মধুপুর মনিপাড়ায়।
প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। বাড়ির উঠান কিংবা ঘরের এক কোণে বসে বাঁশ-বেত কেটে, চিরে, বুনে তৈরি করা হচ্ছে শৌখিন সামগ্রী। কারও হাতে ঝুড়ি, কারও হাতে ডালা, কারও হাতে তৈরি হচ্ছে মোড়া, দোলনা, ফুলের টব, পাখা, ঝাড় কিংবা গৃহসজ্জার সামগ্রী।
এই শিল্পীদের অনেকের জীবনেই যেন একই গল্প। দাদা ছিলেন কারিগর, বাবা ছিলেন কারিগর, এখন তিনিও কারিগর, সন্তানদের হাতেও উঠেছে বাঁশ-বেতের কাজ। অর্থের চেয়ে ঐতিহ্য আর বাপ-দাদার পেশার প্রতি টান থেকেই যেন এই শিল্প আঁকড়ে ধরে আছেন তারা।
বাঁশ ও বেত শিল্পের কারিগর যতিন কুমার দাস বলেন, ‘অতীতে কোনো সরকারই আমাদের এই শিল্পের প্রতি গুরুত্ব দেয়নি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিসের চাহিদা রয়েছে, আমরা যদি নিজেরা কম খরচে সরকারের সহযোগিতায় দেশের বাইরে রপ্তানি করতে পারতাম তাহলে বেশি লাভবান হতাম।’
কারিগররা জানিয়েছেন, এই শিল্পের বড় সংকট এখন কাঁচামাল। বাঁশ ও বেত সংগ্রহ করতে হয় দূর-দূরান্ত থেকে। কুষ্টিয়া, সিলেট, বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কাঁচামাল কিনে আনতে হয়।
কাঁচামালের বাড়তি দামের সঙ্গে যোগ হচ্ছে পরিবহন খরচ। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলেও সে অনুযায়ী বাড়ছে না পণ্যের দাম। আবার আধুনিকতার সঙ্গে প্লাস্টিক ও ধাতব পণ্যের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এই শিল্পের বাজারও সংকুচিত হয়েছে। তবুও হার মানেননি মধুপুর মনিপাড়ার কারিগররা। লাভ কম, কাঁচামালের দাম বেশি, সবকিছু মেনে নিয়েও তারা ধরে রেখেছেন বাপ-দাদার পেশা। কারণ, এটি শুধু তাদের জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি তাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি, পরিচয় ও ঐতিহ্য।
কারিগর নিরঞ্জন দাস বলেন– সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা, আধুনিক ডিজাইনের প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিলে এই শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
নিরঞ্জন দাসের মতো আরও কয়েকজন কারিগরের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাদের কণ্ঠে হতাশার ছাপ পাওয়া গেল। বর্তমানে প্রযুক্তির ব্যবহার ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় দিন দিন বাঁশ-বেত শিল্প পণ্যের ব্যবহার হারিয়ে যেতে বসেছে। এই ব্যবসায় মন্দাভাব থাকায় বাঁশ-বেত শিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোতে চলছে দুর্দিন।
- বিষয় :
- মুন্সীগঞ্জ