দিনের বেলায় ‘সার নেই’, রাতে মেলে বাড়তি টাকায়
শিবালয় (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৬
মানিকগঞ্জের শিবালয়ে বাড়তি টাকা ছাড়া সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন অনেক কৃষক। তারা বলছেন, দিনের বেলা ডিলারদের দোকানে গেলে সংকটের কথা বলে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে বাড়তি টাকা দিলে রাতের বেলা সার সরবরাহ করা হয়। চাষিদের ফোন নম্বর ক্যাশ মেমোতে লিখে রাখার নিয়ম থাকলেও অনেক ডিলার তা মানছেন না। এদিকে, বিভিন্ন অভিযোগে ছয়জন ডিলারকে শোকজ করেছে উপজেলা কৃষি অফিস।
কৃষকদের অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, কিছু ডিলার সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বস্তাপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন। কৃষকরা বলছেন, যারা বস্তাপ্রতি চাহিদামতো টাকা দিচ্ছেন না তাদের ‘সার নেই’ বলে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। অনেক ডিলার ক্যাশ মেমোতে কৃষকদের নাম লিখলেও তাদের মোবাইল নম্বর লিখছেন না। মূলত, অতিরিক্ত দাম নেওয়ার বিষয়ে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যেন কেউ যোগাযোগ না করতে পারে এজন্যই নম্বর রাখা হয় না। যদিও কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, সার কেনা কৃষকদের নাম ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর লিখে রাখার জন্য ডিলারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলার ষাইটঘর তেওতা সুকুমার শীল বলেন, আমি কয়েকদিন আগে ২৭ টাকা কেজির ইউরিয়া সার ৩৫ টাকা করে কিনেছি। উপজেলার বরংগাইল এলাকার ছবেদ আলী সার ডিলারের নাম উল্লেখ না করার শর্তে বলেন, আমি বরংগাইল থেকে এক হাজার ৩৫০ টাকা বস্তার ইউরিয়া সার ১৭০০ টাকা দিয়ে কিনেছি।
আড়াকান্দি গ্রামের মালেক শেখ বলেন, নয়াবাড়ী থেকে এক বস্তা ইউরিয়া সার কিনতে দিনের বেলা গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে দেয়নি। পরে ১৬০০ টাকা দিয়ে রাতের বেলায় সার কিনেছি।
গোয়ালখালী গ্রামের আবেদ শেখ বলেন, দিনে সারের দোকানে গেলে সার নেই বলে ঘুরিয়ে দেয়। আমি পাঁচ বিঘা জমিতে আমন ধান রোপণ করেছি। পরে বস্তাপ্রতি ১৫০ টাকা বেশি দিয়ে দুই বস্তা সার এনেছি।
এ রকম অনেক কৃষকই বেশি দাম দিয়ে সার কেনার কথা জানিয়েছেন। পরে সার না পাওয়ার ভয়ে তারা কোনো ডিলারের কাছ থেকে এভাবে সার কিনেছেন তা বলতে রাজি হননি।
সম্প্রতি বিভিন্ন অভিযোগে উপজেলার ছয়জন ডিলারকে শোকজ করেছে কৃষি অফিস। এগুলো হলো উথলী ইউনিয়নের নয়াবাড়ী বাজারের সমতা কৃষিভাণ্ডার, আরুয়া ইউনিয়নের নালী বাজারের ইমান ট্রেডার্স, মহাদেবপুর ইউনিয়নের আব্দুল লতিফ অ্যান্ড সন্স, বরংগাইল বাজারের নিজাম বীজ ভাণ্ডার ও মিজান এন্টারপ্রাইজ এবং শিবালয় ইউনিয়নের মরিয়ম ট্রেডার্স।
উথলী ইউনিয়নের নয়াবাড়ী বাজারের বিসিআইসি ও বিএডিসি সার ডিলার সমতা কৃষি ভাণ্ডারের মালিক আশরাফুল আলম রাজা বলেন, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী আমরা সার বরাদ্দ পাইনি। এ ছাড়া, এ বছর আমাদের এলাকায় বর্ষা কম হয়েছে। ফলে আমন ধানসহ শাকসবজির আবাদ বেশি হচ্ছে। এ কারণে সারের চাহিদাও বেশি। তিনি আরও বলেন, আমি কৃষকদের কাছে থেকে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছি না। চাহিদা অনুযায়ী সার দিতে না পারায় কিছু কৃষক অতিরিক্ত দাম নেওয়ার কথা বলছেন। তবে কিছু সাব ডিলার অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করেন বলে শুনেছি। তাঁর দোকানের ক্যাশ মেমোতেও সার কেনা বেশির ভাগ কৃষকের ফোন নম্বর দেখা যায়নি।
তাঁকে কৃষি অফিস কী কারণে শোকজ করেছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সময়মতো বরাদ্দকৃত সার না আনতে পারায় আমাকে শোকজ করা হয়েছিল। আমি জবাব দিয়েছি।
নালী বাজারের ইমান ট্রেডার্সের ডিলার খবির উদ্দিনকে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির কারণে ১৮ আগস্ট শোকজ করে কৃষি অফিস। জানতে চাইলে তিনি বলেন, বরাদ্দকৃত সার আনতে দেরি হওয়ার কারণে শোকজ করা হয়েছিল। আমি জবাব দিয়েছি। তিনি বলেন, জুলাইয়ে সারের চাহিদা বেশি ছিল। কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার দিতে না পারায় তারা আমার বিরুদ্ধে দাম বেশি নেওয়ার কথা বলছেন। কিছু কিছু কৃষক দুই তিন বস্তা করে সার নিতে চান। তাদের তা দিতে না পারায় তারা মিথ্যা অভিযোগ করছেন। তবে আমার ইউনিয়নের কিছু সাব ডিলার বেশি দামে সার বিক্রির কথা শুনেছি। আমরা অতিরিক্ত দাম নিতে নিষেধ করেছি।
মহাদেবপুর ইউনিয়নের আব্দুল লতিফ অ্যান্ড সন্সের মেহেদী হাসান বলেন, কিছু কিছু কৃষক রবি মৌসুমে সার না পাওয়ার আশঙ্কায় অগ্রিম সার কেনায় সংকট দেখা দিয়েছে। যার সার লাগবে ১০ কেজি তিনি ৩০ কেজি কিনে ঘরে রেখে দিচ্ছেন। যাদের সার দিতে পারছি না তারা বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করছেন। কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে না।
বরংগাইল বাজারের সাব ডিলার মো. নিজাম বলেন, কৃষকদের সার দিতে না পারায় তারা বেশি দাম রাখার কথা বলে কৃষি অফিসে মিথ্যা অভিযোগ করায় আমাকে শোকজ করা হয়েছে।
বিএডিসি সাব ডিলার মিজানুর রহমান বলেন, কিছু কৃষক অভিযোগ করার কারণে আমাকে শোকজ করা হয়েছে। আমরা কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার দিতে পারিনি। শিবালয় ইউনিয়নের বিসিআইসির ডিলার মরিয়ম ট্রেডার্সের লালন হোসেন বলেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে টিএসপি সার আনতে দেরি হওয়ার কারণে তাঁকে শোকজ করা হয়েছে।
উপজেলা ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, যেসব ডিলারের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি এবং বরাদ্দ পাওয়ার পরও সার উত্তোলন না করার অভিযোগ ছিল তাদের শোকজ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অনেক কৃষকই ডিলারদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম দিয়ে সার কেনার কথা মৌখিকভাবে অভিযোগ করছেন। কেউ লিখিত অভিযোগ করতে চান না। এ কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ডিলারদের জেল জরিমানা করতে পারছি না।
উপজেলায় সাতজন বিসিআইসি ডিলার ও ৬৩ জন সাব ডিলার রয়েছেন। গত আগস্ট মাসে ১৫০ টন ইউরিয়া, ৫৪ টন টিএসপি, ২০ টন ডিএপি ও ৩০ টন এমওপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত জুলাই মাসে ১০০ টন ইউরিয়া, ৩৪ টন টিএসপি, ২৩ টন ডিএপি ও ২৫ টন এমওপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এবার উপজেলায় রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৯ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৫৭ হেক্টর। আউশের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৮ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৬১ হেক্টর ফসলি মাঠে। গ্রীষ্মকালীন সবজির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৫৫ হেক্টর ফসলি মাঠে। উপজেলায় কৃষক ৩৬ হাজার ৭১৫ জন।