‘আমার মনিরা কথা বলছে না কেন?’
ডেঙ্গু জ্বরে মারা যাওয়া শিশু মনিরার স্বজনের আহাজারি। গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের আমিরাবাদ এলাকার বাড়ি থেকে তোলা -সমকাল
চট্টগ্রাম ব্যুরো ও সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪৩ | আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘মনিরা, ও মনিরা। মনিরা কেন এভাবে শুয়ে আছে? আমার মনিরা কথা বলছে না কেন? মা বলে ডাকছে না কেন? ও আল্লাহ, তুমি কেন আমাকে এত বড় শাস্তি দিলে?’
গতকাল বৃহস্পতিবার এভাবেই আহাজারি করছিলেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ডেঙ্গু জ্বরে মারা যাওয়া শিশু মনিরার মা হাসান বানু লাকি। ৫ বছর বয়সী শিশুটির বাবা মো. নুরুন্নবীও কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
গতকাল দুপুরে মনিরার লাশবাহী গাড়িটি সীতাকুণ্ডের আমিরাবাদ এলাকার বাড়িতে পৌঁছায়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গতকাল তার মৃত্যু হয়।
মনিরা উপজেলা সদর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নার্সারির ছাত্রী ছিল। গতকাল বাদ জোহর পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন বাবা নুরুন্নবী ও বড় বোন দশম শ্রেণির ছাত্রী সিদরাতুল মুনতাহা। গতকাল বিকেলে তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের আহজারির মধ্যে নুরুন্নবী মেয়ের হাতের লেখা বই-খাতা, পরনের জামা-কাপড় জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদছেন। মাঝে মাঝে মেয়ের ছবি বুকে নিয়ে ‘মনিরা মনিরা’ বলে বিলাপ করছেন। পাশের কক্ষে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন মা হাসান বানু। এ সময় তাদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে স্বজনদেরও কাঁদতে দেখা যায়।
স্বজনরা জানান, নুরুন্নবী চাকরি করে সামান্য আয়ে সংসার চালান। তবে তাঁর বড় স্বপ্ন ছিল। দুই মেয়েকেই পড়াশোনা করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ছোট মেয়ের মৃত্যুতে তাঁর স্বপ্ন এলোমেলো হয়ে গেল।
স্বজনরা জানান, ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে মনিরার তীব্র জ্বর ওঠে। পরদিন জ্বরের সঙ্গে নানান শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। ১৫ সেপ্টেম্বর পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে তাকে নেওয়া হয়। চমেক হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন চিকিৎসক। সেখানে ভর্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হলে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। গতকাল সকালে তার মৃত্যু হয়।
এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মো. রাফসান নামে ২৬ বছর বয়সী এক যুবকের মৃত্যু হয়। তিনি সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের তুলাতলী এলাকার বাসিন্দা। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রাণ গেল দুজনের।
ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ সীতাকুণ্ড
সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এতে ডেঙ্গুর ‘হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে উপজেলাটি। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলার মধ্যে সর্বোচ্চ ৪২৭ রোগী শনাক্ত হয়েছে সীতাকুণ্ডে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে সর্বোচ্চ ৯৩ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে আক্রান্ত হয়েছেন তিন হাজার ২২০ জন, মৃত্যু হয়েছে ১৫ জনের। এর মধ্যে চলতি মাসের প্রথম ১৭ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ১৮৪ জন, মারা গেছেন ৯ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এমন হার চলতি বছরের আগের আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলতাফ হোসেন বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে নতুন করে অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১০টি শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে।
চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া বলেন, ডেঙ্গুতে শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো শক সিনড্রোম। এতে রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হয়। ফলে দ্রুততার সঙ্গে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হতে শুরু করে। লিভার মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হওয়া, হৃদযন্ত্রের সমস্যা এবং মস্তিষ্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কারণে কম সময়ের ব্যবধানে শিশুর মৃত্যু ঘটে।
এক দিনে সারাদেশে ৫ মৃত্যু
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭৬ জনে।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ডেঙ্গু-সংক্রান্ত ড্যাশবোর্ডে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৪৮৪ জন। ফলে চলতি বছরে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৪০০। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৯২ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে তিন নারী ও দুজন পুরুষ। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ১৭৬ জনের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং পুরুষ ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ।