‘বাবার কথা মনে হইলে আমার কলিজা ফাইট্টা যায় আঙ্কেল’
মায়ের সঙ্গে শিশু সাদিয়া আক্তার
দেবিদ্বার (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:৩১
‘পা ভাঙা দেখে বাবা আমাকে শেষবারের মতো লোকমা দিয়ে ভাত খাওয়াইছিল। বাবার কথা মনে হইলে আমার কলিজা ফাইট্টা যায় আঙ্কেল। আমার বাবাকে ফেরত দিতে পারবেন? যত টাকা লাগে আমি দেব, তবুও আমার বাবাকে ফেরত চাই। আমার বাবা আর আসবে না।’ এ আকুতি কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের বারুর গ্রামের ১০ বছরের শিশু সাদিয়া আক্তারের। দ্বিতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থী চোখের সামনে বাবাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। আজ শনিবার বিকেলে বাড়ির উঠানে বসে বাবার কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।
নিহত সফিকুল ইসলাম (৪০) বাঁশ ও বেতের কারিগর ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রতিবেশী এনামুল হক লিমন ও তাঁর ভাতিজা এমদাদুল হক নিশাদসহ কয়েকজন তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে সাদিয়া বলে, ‘বিকেলে ভাত খাইতে বসছিলাম। আমার পা ভাঙা, তাই বাবা আমাকে লোকমা দিয়ে ভাত খাইয়ে দিচ্ছিল। তখন লিমন কাকা কী একটা জিনিস দেওয়ার কথা বলে বাবাকে ডেকে নেয়। এরপরই ছুরি দিয়ে বাবাকে কোপাতে থাকে। আমি চিৎকার করে বলছি—লিমন কাকু, আমার বাপেরে আর মাইর না। কিন্তু কাকা আমার কথা শোনেনি। চোখের সামনেই বাবাকে মেরে ফেলল।’
সফিকুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়ে শোকের পরিবেশ। এক পাশে বসে বিলাপ করছিলেন তাঁর স্ত্রী নারগিস আকতার। দুই ছেলে সামিউল ও ইমন নির্বাক হয়ে বসে ছিল।
নারগিস আকতার বলেন, ‘আমার আয়ের আর কোনো পথ নেই। স্বামী-স্ত্রী মিলে তিন সন্তানকে নিয়ে কষ্টে সংসার চালাচ্ছিলাম। চোখের সামনে আমার স্বামীকে কুপিয়ে মারা হলো। ভয়ে কেউ তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। দুই বছরের ছোট ছেলেটা শুধু বাবা বাবা করে ডাকছে। সে বাবা কোথায় পাবে? আমি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার ও আসামিদের ফাঁসি চাই।’
এ ঘটনায় পুলিশ এনামুল হক লিমন ও নজরুল ইসলাম নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
আসামিদের বাড়িতে ভাঙচুর
হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে খোদাইচর বটতলা এলাকায় মানববন্ধন করেন বারুর এবং বারেরা-খোদাইচর এলাকার বাসিন্দারা। মানববন্ধন শেষে উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত এনামুল হক লিমন ও নজরুল ইসলামের বাড়িতে হামলা চালিয়ে আসবাবপত্র ভাঙচুর ও লুটপাট করে। খবর পেয়ে দেবিদ্বার-ব্রাহ্মণপাড়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. শাহীন ও দেবিদ্বার থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামানসহ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
দেবিদ্বার থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সফিকুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। হত্যাকাণ্ডের পর আসামিদের বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- কুমিল্লা
- কুপিয়ে হত্যা
- গ্রেপ্তার