ঢাকা সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

খুলনার ডুমুরিয়া

রাস্তায় রান্না, ঘরের মাচায় ঘুম

রাস্তায় রান্না, ঘরের মাচায় ঘুম
×

চারদিকে পানি। এ অবস্থায় ডিঙি নৌকা ছাড়া বিল ডাকাতিয়ার আশপাশে যাতায়াত করা যায় না। গত শনিবার ডুমুরিয়া উপজেলার রংপুর গ্রামে। ছবি: সমকাল

এম এ এরশাদ, ডুমুরিয়া (খুলনা)

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩২

বিল ডাকাতিয়ায় ১৮ বিঘা আয়তনের ঘের রয়েছে বিমল কৃষ্ণ মণ্ডলের। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রংপুর গ্রামের এই বাসিন্দা ঘেরের আইলে চাষ করেন নানা সবজি। ২০২৫-এর জুনে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে বিলের পানি বাড়তে থাকায় তলিয়ে যায় তাঁর সবকিছু। চলতি বছরের অক্টোবরেও সরেনি পানি। এতে তাঁর প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। 

গত শনিবার ও গতকাল রোববার উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে কৃষক ও মৎস্য চাষিদের বিপুল ক্ষতির তথ্য জানা গেছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রায় ৯ বছর পর এই বিলের আশপাশের জনপদে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। বিলের পার্শ্ববর্তী ভদ্রা ও বুড়িভদ্রা নদী দুটি পুরোপুরি ভরাট হওয়ায় পানি নামতে পারছে না। এতে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমির চিংড়ি ও অন্যান্য মাছের ঘের, সবজিসহ নানা ফসলের ক্ষেত এখনও তলিয়ে আছে। পানি উঠে রয়েছে গ্রামবাসীর বাড়িঘরেও। 

উপজেলার রংপুর ইউনিয়নের রংপুর গ্রামের পারুল হালদার, বটবেড়া গ্রামের জয়ন্তী মণ্ডল শনিবার জানান, তাদের সবার বসতভিটা তলিয়ে গেছে। ডিঙি নৌকায় রাস্তার উঁচু জায়গায় গিয়ে রান্নাবান্না করছেন। তলিয়ে যাওয়া ঘরের ভেতর মাচা বেঁধে রাতে ঘুমাতে হচ্ছে। 

রংপুর গ্রামে কথা হয় কৃষক রতন বিশ্বাস, চিত্তরঞ্জন বালা, শিবপদ বৈরাগী, মিহির মণ্ডল ও প্রীতির ঢালীর সঙ্গে। তাদের প্রত্যেকের বিল ডাকাতিয়ায় ১৫-২০ বিঘা জমি রয়েছে। ১৫ মাস ধরে তাদের সব জমি পানিতে নিমজ্জিত। ফলে ধান, মাছ, সবজি; কোনোটাই চাষ করা যাচ্ছে না। আয় হারিয়ে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন তারা।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিসেবে পরিচিত বিল ডাকাতিয়ার অবস্থান খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা থানা, নগরীর খানজাহান আলী থানা ও আড়ংঘাটা থানা, যশোরের অভয়নগর, কেশবপুর ও মনিরামপুর উপজেলার বিশাল অংশে। জলাবদ্ধতার কারণে এই বিল আশির দশকে আশপাশ এলাকার বাসিন্দাদের জন্য অভিশাপ হিসেবে দেখা দেয়। ১৯৯২-৯৩ সালে ২২৯ কোটি টাকা খরচে খুলনা-যশোর পানি নিষ্কাশন পুনর্বাসন প্রকল্প (কেজেডিআরপি) বাস্তবায়ন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এ ছাড়া ডুমুরিয়ার রংপুর ইউনিয়নের শলুয়া স্লুইসগেট থেকে কৈয়ার শোলমারী পর্যন্ত নদী খনন ও শলুয়া থেকে বিল ডাকাতিয়ার মাঝখান দিয়ে ফুলতলা উপজেলার জামিরা পর্যন্ত ৮০ ফুট চওড়া খাল খনন করা হয়। এর পর থেকে বিল ডাকাতিয়ার পানি কিছুটা নামতে শুরু করে। বেশ কয়েক বছর ডুমুরিয়া এলাকায় তেমন জলাবদ্ধতা হয়নি। ২০১৭ সালে জলাবদ্ধতা দেখা দিলেও পাউবোর কাজে দ্রুত সময়েই তা সমাধান হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শোলমারী ও ভদ্রা নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় নতুন দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। নদী দুটি দিয়ে বিলের পানি নামতে পারছে না। 

এলাকাবাসীর ভাষ্য, পলি জমে পাউবোর বেড়িবাঁধের নদীর অংশ উঁচু ও বাঁধের ভেতর নিচু হয়ে গেছে। এ কারণে পানি বিল ডাকাতিয়া থেকে সরতে পারছে না। ভরাট হওয়া নদী খননের বিকল্প নেই। উপজেলার রংপুর ইউনিয়নের প্রায় পুরোটাই এবং রঘুনাথপুর, ধামালিয়া, রুদাঘরা, ডুমুরিয়া সদর, গুটুদিয়া ও খর্নিয়া ইউনিয়নের বহু গ্রামের মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার। 

সরেজমিন দেখা যায়, চারদিকে থইথই পানি। কোনো বাড়ির মধ্যে এক থেকে দেড় ফুট, কোনো বাড়ির আঙিনায় হাঁটুপানি। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। এ ছাড়া গবাদি পশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন মানুষ। অনেক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেও পানি উঠে গেছে। 

মজারখুটা গ্রামের নমিতা মণ্ডলের পরিবার ১১ মাস পানির সঙ্গেই বসবাস করছে। তাঁর শোয়ার ঘরেও পানি। ভেতরে মাচা তৈরি করে রাতে ঘুমাতে হচ্ছে। রান্নাবান্না হচ্ছে সেখানেই। 

বটবেরা গ্রামের প্রমীলা সরকারের বাড়িতে দুটি বসতঘর। সাত মাস ধরে দুটি ঘরের মেঝেই তলিয়ে আছে। শোয়ার ঘরে খাটের ওপর মাটির চুলা বসিয়ে রান্নাবান্না করছেন। রাতে উঁচু খাটের ওপর দুই সন্তান ও স্বামী নিয়ে রাত কাটাতে হচ্ছে তাঁকে। এমনকি এই পরিবারের শৌচাগারও পানিতে তলিয়ে আছে।

বারানসি গ্রামের কৃষক পরিমল মণ্ডল জানালেন, তাঁর দুটি বসতঘর ও গোয়ালঘরে পানি উঠেছে ৯ মাস আগে। এখনও নামার লক্ষণ নেই। চারটি গরু অন্য গ্রামে আত্মীয়বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। দিনের বেলায় পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে থাকলেও রাতে রংপুর গ্রামে অন্যের বাড়িতে ঘুমাতে যান। 

এই গ্রামের বাসিন্দা পরিমল মণ্ডল ও কালীপদ বৈরাগী দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন। কিন্তু জমি-ঘের তলিয়ে থাকায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। বাধ্য হয়ে তাদের মতো দরিদ্র মানুষ বিলে বড়শি বা ফাঁসজাল দিয়ে মাছ ধরে বিক্রি করেন। কারও কারও জীবিকা বিল থেকে তোলা শাপলা-শামুকের ওপর নির্ভরশীল। 

সাড়াতলা ও মজারখুটা গ্রামের কৃষক কমলেশ বাগচী, সুতপা হালদার, প্রবাসী হালদার, যশোদা হালদারের ভাষ্য, এলাকায় কর্মসংস্থান নেই। সরকারি কোনো সহায়তাও পাচ্ছেন না। বেশির ভাগ গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে পানি থইথই করছে। ডিঙি নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে নিত্যদিনের কাজ করতে হয়। এভাবেই শিশুসন্তানদের বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়া করতে হচ্ছে। এ ছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে পানি দূষিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চর্মরোগ, ডায়রিয়া। বেড়েছে বিষধর সাপের উপদ্রবও।

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামানের দেওয়া তথ্যমতে, ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলায় বিল ডাকাতিয়ার মধ্যে ১২০ হেক্টর জমিতে ৪ হাজার ২০০ মাছের ঘের রয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ ঘের কোনোমতে টিকে আছে। ৬৫ শতাংশ ঘের এখনও তলিয়ে আছে। জলাবদ্ধতার কারণে ১৫ মাসে প্রায় ৮০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-খুলনার উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলামের ভাষ্য, বিল ডাকাতিয়া এলাকায় রোপা আমন, সবজি, মরিচসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষেতের বেশির ভাগই পানিতে নিমজ্জিত। তারা উপজেলাভিত্তিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ের কাজ শুরু করছেন। শুধু বিল ডাকাতিয়া এলাকায় কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার আলাদা কোনো তালিকা তৈরি হয়নি।

বিল ডাকাতিয়া-সংলগ্ন ডুমুরিয়া উপজেলার ২ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানান জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল করিম। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, তিন উপজেলার ৩১৩টি গ্রামের ৩২ হাজার ১৫২টি পরিবারের ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৩০ জন পানিবন্দি।

কেজেডিআরপি প্রকল্প বাস্তবায়নের পর বিল ডাকাতিয়া জলাবদ্ধতামুক্ত হয়েছিল বলে জানান পাউবো খুলনা বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে একবার জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছিল। তখন ছোট একটি প্রকল্পের অধীনে কিছু কাজ করা হয়। আবার জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বিল ডাকাতিয়া ও আশপাশ এলাকায় প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমি জলাবদ্ধ। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। আপাতত ভাসমান কিছু এক্সক্যাভেটর দিয়ে নদী-খালের পলি সরানো হচ্ছে। গ্রামের লোকজনও এতে স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন। চার-পাঁচ দিন ধরে কিছু এলাকা থেকে ধীরে ধীরে পানি নামছে। 

ডুমুরিয়ায় জলাবদ্ধতা নিরসন করা নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল জানিয়ে খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ আলি আসগার লবী বলেন, ইতোমধ্যে নদী-খাল খনন শুরু হয়েছে। জনদুর্ভোগ লাঘবে বড় পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছর তা বাস্তবায়ন সম্ভব বলে তিনি আশাবাদী। 

আরও পড়ুন

×