ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

আন্দোলনের মধ্যেই চুয়েট উপাচার্যের নির্দেশে আটকে গেল শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন

আন্দোলনের মধ্যেই চুয়েট উপাচার্যের নির্দেশে আটকে গেল শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন
×
×

চুয়েট শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল

চুয়েট সংবাদদাতা

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:২০

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সেপ্টেম্বর মাসের বেতন ও উৎসব ভাতা আটকে গেছে। নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের নির্দেশের পর বেতন বিল পরিশোধ স্থগিত রেখেছে সোনালী ব্যাংকের চুয়েট শাখা।

সাধারণত মাসের ৩০ বা ৩১ তারিখের মধ্যে চুয়েটের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করা হয়। তবে এবার নির্ধারিত সময়ে বেতন না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১ হাজার ১০০ শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী। দুর্গাপূজার আগে বেতন ও উৎসব ভাতা না পাওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষক-কর্মচারীরাও।

চুয়েটে বর্তমানে ৩৬৭ জন শিক্ষক, ২০৮ জন কর্মকর্তা ও ৫১২ জন কর্মচারী রয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকের চুয়েট শাখার ব্যবস্থাপক জয়ন্ত ভৌমিককে ই-মেইল করে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম।

এরপর ৫ অক্টোবর ব্যাংক ব্যবস্থাপক ফিরতি ই-মেইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পট্রোলার ও উপ-কম্পট্রোলারের স্বাক্ষরযুক্ত বেতন বিল পাওয়ার বিষয়টি উপাচার্যকে জানান। জবাবে উপাচার্য বলেন, তার পূর্বানুমোদন ছাড়া ব্যাংকে বেতন বিল পাঠানো ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’।

উপাচার্য তার ই-মেইলে চুয়েট আইন, ২০০৩-এর ১৩(৭) ধারা উল্লেখ করে বলেন, তার ‘সুস্পষ্ট অনুমোদন’ ছাড়া কোনো আর্থিক লেনদেন আইনত অবৈধ। এ ধরনের লেনদেনের ফলে কোনো আর্থিক অনিয়ম, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা আইনি জটিলতা সৃষ্টি হলে এর দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নেবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সোনালী ব্যাংকের চুয়েট শাখার ব্যবস্থাপক জয়ন্ত ভৌমিক বলেন, প্রতি মাসের মতোই হিসাব নিয়ন্ত্রক ও উপহিসাব নিয়ন্ত্রকের স্বাক্ষর করা শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতার শিট তারা পেয়েছেন। তবে উপাচার্য ই-মেইল ও চিঠির মাধ্যমে বেতন-ভাতা স্থগিত রাখতে বলেছেন।

জয়ন্ত ভৌমিক বলেন, উপাচার্য বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন। এরপর বিষয়টি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তারা এ বিষয়ে আইনি মতামত নিতে বলেছেন। মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পট্রোলার মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

চুয়েট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রকৌশলী সৈয়দ মোহাম্মদ ইকরাম বলেন, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বেতন-বোনাস পরিশোধে উপাচার্যের স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয় না। হিসাব নিয়ন্ত্রক ও উপহিসাব নিয়ন্ত্রকের স্বাক্ষরের ভিত্তিতেই ব্যাংক থেকে বেতন-বোনাস ছাড় করা হয়। সে অনুযায়ী সেপ্টেম্বরের বেতন বিলও ব্যাংকে পাঠানো হয়েছিল।

তার ভাষ্য, এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা পরিস্থিতি তৈরি হলেও শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-বোনাস কখনো বন্ধ হয়নি। তাদের দাবি, আন্দোলনে সংহতি জানানো শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর চাপ তৈরির অংশ হিসেবে বেতন আটকে রাখা হয়েছে।

চুয়েট শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সামিউন বাসির বলেন, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কম্পট্রোলারের মাধ্যমে সেপ্টেম্বরের বেতন বিলও ব্যাংকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু উপাচার্যের হস্তক্ষেপে এখন পর্যন্ত কেউ বেতন পাননি। তিনি বলেন, ‘এতদিন যেভাবে বেতন নেওয়া হচ্ছিল, তা যদি নিয়মের বাইরে হয়ে থাকে, তাহলে এত দিন যারা বেতন নিয়েছেন, তাদের বেতনও কেটে নেওয়া হোক।’

তবে বেতন আটকে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেননি উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম। তিনি বলেন, তিনি কম্পট্রোলারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সভায় ডেকেছিলেন। কিন্তু তাঁরা কেউ আসেননি। পরে তিনি ব্যাংকের ব্যবস্থাপককে ই-মেইল করেন।

উপাচার্য বলেন, তার ই-মেইলের পরই ব্যাংক বেতন-ভাতা স্থগিত রেখেছে। তিনি আরও বলেন, এত দিন যেভাবে বেতন দেওয়া হচ্ছিল, সেটি আইনত বৈধ ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী উপাচার্যের অনুমোদন নেওয়ার কথা থাকলেও এত দিন তা মানা হয়নি।

গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর নতুন উপাচার্যের নিয়োগ বাতিল ও সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতিতে যান। টানা ১৫ দিনের শাটডাউনে চুয়েটে ক্লাস-পরীক্ষাসহ একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে।

আরও পড়ুন

×