ডোপ টেস্টের রেজাল্ট মিলছে কম্পিউটারের দোকানে
জাল ডোপ টেস্টের ছবি, যা মিলছে কম্পিউটারের দোকানে। ছবি: সমকাল
বগুড়া ব্যুরো
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ০৯:১৭ | আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ০৯:১৭
বগুড়ায় ডোপ টেস্টের (রক্তে ও প্রস্রাবে মাদকের উপস্থিতি আছে কি’না তার পরীক্ষা) রেজাল্ট মিলছে কম্পিউটারের দোকানে। ১৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা দিলেই চাহিদা মত ডোপ টেস্টের ‘নেগেটিভ’ রেজাল্ট বানিয়ে দিচ্ছেন দোকানিরা।
শহরের জিরো পয়েন্ট সাতমাথা সংলগ্ন সপ্তপদী মার্কেটে একটি দোকানে ‘বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ’-এর প্যাড বানিয়ে করা ডোপ টেস্টের একটি রেজাল্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সমকালের কাছে এসেছে। জাল সেই সনদে সরকারি ওই হাসপাতলের প্যাথলজি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন কর্মীর সীল এবং স্বাক্ষরও নকল করা হয়েছে।
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ কর্তৃপক্ষ অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করেছে। এতে যাদের রেজাল্ট ‘নেগেটিভ’ আসবে কেবলমাত্র তারাই ভর্তির যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মেধা তালিকায় সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীদের আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভর্তি হতে হবে।
হাতে সময় খুব কম থাকায় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা ডোপ টেস্টের জন্য গত ক’দিন ধরে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল, শহীদ জিয়াউর রহমান হাসপাতাল এবং বেসরকারি একাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে ভিড় করছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা ফি নেওয়া হলেও বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে ১ হাজার ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার টাকা ফি নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সরকারি হাসপাতাল ও বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে ডোপ টেস্টের ফি বেশি, রেজাল্ট পেতে অনেক সময় লাগে। এর পাশাপাশি যারা মাঝে মাঝে মাদক সেবন করে তাদের রেজাল্ট ‘পজিটিভ’ আসতে পারে এমন শঙ্কা থেকেই সরকারি আজিজুল হক কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের অনেকে ডোপ টেস্ট না করিয়েই নিজেদের পক্ষে জাল টেস্ট রিপোর্ট নিতে নির্দিষ্ট কিছু কম্পিউটার দোকানে ভিড় করছে।
সমকালের হাতে আসা জাল ডোপ টেস্টের একটি রেজাল্টে দেখা গেছে তাতে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোগ্রাম সম্বলিত প্যাথলজি বিভাগের IMMUNOLOGICAL TEST REPORT লেখা প্যাড বানিয়ে Amphitamine, Beûoid, Opieats,Canabinoids এবং Alcohol এর রিপোর্টগুলো ÔNegative (-ve)’ উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্টে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডিএমটি মেডিসিন বিভাগের টেকনোলজিস্ট (ল্যাব), একই হাসপাতলের প্যাথলজি বিভাগের সিনিয়র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর সীল ও স্বাক্ষর এবং ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্টের স্বাক্ষর দেওয়া হয়েছে। এমনকি ফটোকপি করা ওই জাল সনদটি ‘সত্যায়িত’ দেখানোর জন্য পার্শ্ববর্তী জেলার এক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সীল এবং স্বাক্ষরও জাল করা হয়েছে।
জাল ওই ডোপ টেস্টের সনদ গ্রহণকারী সমকালকে বলেছেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে টেস্ট করাতে গেলে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়াতে হয় এবং পয়সাও বেশি লাগে। তাছাড়া রেজাল্ট পেতে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়। তিনি বলেন, ‘পরিচিত একজন আমাকে জানালো সপ্তপদী মার্কেটের পরিচিত কিছু কম্পিউটারের দোকানে চাহিদা মত ডোপ টেস্টের রেজাল্ট পাওয়া যাচ্ছে। তাই আমি সেখান থেকে ১৫০ টাকায় করিয়ে নিয়েছি।’
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ জানান, তার প্রতিষ্ঠানের প্যাথলজি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের অজান্তেই তাদের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে ডোপ টেস্টের রেজাল্ট তৈরি করা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ শাহজাহান আলী জানান, তারা ডোপ টেস্টের সবগুলো রেজাল্টই পরীক্ষা করবেন। যদি কারও রেজাল্ট ভুয়া বলে প্রমাণিত হয় তাহলে ওই শিক্ষার্থীকে ডোপ টেস্ট করানো হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি পুলিশকেও জানাবো।’
বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ জানান, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমাদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অনুরোধ জানানো হবে।’
- বিষয় :
- ডোপ টেস্ট
- রেজাল্ট
- কম্পিউটার দোকান
- বগুড়া
