চরমোনাইতে নৌকার পক্ষে বিএনপির ভোট চাওয়ার নেপথ্যে
সুমন চৌধুরী, বরিশাল ব্যুরো
প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২১ | ১১:১২ | আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০২১ | ১২:৩১
রাজনীতিতে বিএনপি-আওয়ামী লীগের সম্পর্ক সাপে-নেউলে। যেকোন স্তরের নির্বাচনে এ সম্পর্ক আরও উত্তাপ ছড়ায়। দেশের রাজনীতিতে প্রচলিত এ নিয়মটি পাল্টে গেছে বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নে। সেখানে প্রতিদিন মাইকে প্রচার হচ্ছে- ‘সালাম রাঢ়ীর সালাম নিন, নৌকা মার্কায় ভোট দিন’।
আব্দুস সালাম রাঢ়ী চরমোনাই ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে নৌকা মার্কায় ভোটও চাইছেন তিনি। এখানে নৌকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী চরমোনাই পীরের ছোট ভাই সৈয়দ মো. জিয়াউল করীম। বৃহস্পতিবার চরমোনাইতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ইসলামী আন্দোলনের সূতিগার এ ইউনিয়নটিতে ২০০২ সাল থেকে পীর পরিবার সদস্যরা চেয়ারম্যান পদে আছেন। এবার তাদের হটাতে নৌকার প্রার্থীর সঙ্গে একাট্টা হয়েছেন সালাম রাঢ়ীর নেতৃত্বে ইউনিয়ন বিএনপি। তিনি ২০০২ সালে পীর পরিবারের কাছে চেয়ারম্যান পদটি হারান। তখন সালাম রাঢ়ীকে পরাজিত করতে আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে পীর পরিবারের পক্ষে ছিলেন।
২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন চরমোনাইর রাজারচর বিদ্যালয় কেন্দ্রে চারদলীয় জোট প্রার্থী বর্তমানে বিএনপির যুগ্ন মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ারের ওপর হামলার জেরে পীর পরিবারের সঙ্গে বরিশাল বিএনপির এ বিরোধের সূত্রপাত। ওই নির্বাচনে ইসলামী আন্দোনের প্রার্থী ছিলেন তখনকার পীর পুত্র মুফতি সৈয়দ মো. ফয়জুল করীম। পরের বছরই বর্তমান পীর মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে টানা ৩ মেয়াদের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা সালাম রাঢ়ীকে হারান। পরের তিনটি নির্বাচনেও সালাম রাঢ়ীর একই অবস্থা হয়। এবার তিনি প্রার্থী না হয়ে প্রকাশ্যে নৌকার পক্ষে নেমেছেন।
২০০১ সালের ১ অক্টোবর যা ঘটেছিল: মজিবর রহমান সরোয়ারের ওপর হামলার সময় তার সঙ্গী ছিলেন স্থানীয় একটি দৈনিকের ফটো সাংবাদিক খালিদ সাইফুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘হুজুররা জাল ভোট দিচ্ছে এমন খবর পেয়ে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সরোয়ার ইউপি চেয়ারম্যান সালাম রাঢ়ীসহ অনেক নেতাকর্মী নিয়ে চরমোনাইর রাজারচর কেন্দ্রে পৌঁছান। সরোয়ার প্রিজাইডিং অফিসারের কক্ষে ঢুকে ভোট বন্ধ করতে বলেন। এদিকে সরোয়ার কেন্দ্র দখল করেছেন এমন গুজব ছড়িয়ে পীর সমর্থকরা হামলা করে। সরোয়ারের নিরাপত্তারক্ষী কনস্টেবল মুরাদ শর্টগানের দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দিকবিদিক হয়ে সরোয়ার ও তার সঙ্গীরা বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে আশ্রয় নেন। তখন বাহির থেকে এলোপাথাড়ি ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গাছের গুঁড়ি দিয়ে দরজা ভাঙার চেষ্টা করে হামলাকারীরা।
সরোয়ার বেরিয়ে আসলে পীর সমর্থকদের এলোপাথাড়ি লাঠি-ইটের আঘাতে জ্ঞান হারান। দুই নিরাপত্তারক্ষীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেয় হামলাকারীরা। প্রায় একঘণ্টা ওই পরিস্থিতি চলার পর পীরের আরেক পুত্র বর্তমান চেয়ারম্যান সৈয়দ এছাহাক মো. আবুল খায়ের অনুসারীদের শান্ত করে সরোয়ার ও তার সঙ্গীদের স্পিডবোটে পৌঁছে দেন। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় বর্তমান পীর ও তার কয়েক ভাই একদিন হাজতবাসও করেন। কয়েকমাস পরে দু’পক্ষ নমনীয় হলে তখনকার পীর সৈয়দ ফজলুল করীম (মরহুম) মিষ্টি নিয়ে সরোয়ারের বরিশাল নগরীর বাসায় গিয়ে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা করেন।’
পীরপুত্র বর্তমান চেয়ারম্যান সৈয়দ এছাহাক মো. আবুল খায়ের ওই ঘটনার জন্য তৎকালীন চেয়ারম্যান সালাম রাঢ়ীকে দায়ী করে বলেন, ‘একটি ঘটনা তৈরি করে সরোয়ারের লাশ ফেলার চক্রান্ত করেছিলেন সালাম রাঢ়ী। তার (খায়ের) শক্ত পদক্ষেপের কারণে উদ্দেশ্য হাসিল হয়নি।’
আবুল খায়ের বলেন, ‘মজিবর রহমান সরোয়ারকে ভুল বুঝিয়ে কেন্দ্রে এনে সেটি দখলের চেষ্টা করেন সালাম রাঢ়ী। প্রতিরোধের মুখে সালাম সরোয়ারকে ফেলে একটি ব্যালট বাক্স নিয়ে পালিয়ে যান।’
তখনকার ছাত্রলীগ নেতা গাজী শাহ রিয়াজ বলেন, ‘সরোয়ারের ওপর হামলার ঘটনার মামলায় পীর অনুসারীরা ছাড়াও সালাম রাঢ়ীর ষড়যন্ত্রে তৎকালীন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি গাজী জামাল হোসেনসহ ছাত্রলীগ-যুবলীগের অনেক নেতাকর্মী আসামি হয়েছিলেন। সেই সালাম রাঢ়ী এখন আবার নৌকার ওপর ভর করেছেন।’
২০০২ সালে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন আনোয়ার হোসাইন। তিনি বলেন, ‘সালাম রাঢ়ী টানা ৩ বার চেয়ারম্যান থাকাবস্থায় চরমোনাইসহ কীর্তণখোলার পূর্বাংশের অন্যান্য ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী তার নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন। এজন্য তাকে পরাস্ত করতে ২০০২ সালের ইউপি নির্বাচনে চরমোনাইতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী না দিয়ে তারা পীর পরিবারকে জয়ী করতে ভূমিকা রেখেছিলেন।’
সেই সালাম রাঢ়ী এখন নৌকার পক্ষে কেন জানতে চাইলে আনোয়ার হোসাইন বলেন, ‘এতদিন পর তার শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে।’
এই ব্যাপারে সালাম রাঢ়ী নির্বাচনী প্রচারের শুরুতে সমকালকে বলেন, মজিবর রহমান সরোয়ারের ওপর হামলার পর থেকে বিএনপি নেতাকমীরা পীর পরিবারের নির্যাতনের শিকার। তাই জেলা বিএনপির সিদ্ধান্তে তারা নৌকার পক্ষে নেমেছেন।
জেলা বিএনপির সদ্য সাবেক সভাপতি এবায়েদুল হক চান একই কথা বলেন। কোতোয়ালি থানা বিএনপি শোকজ নোটিশ করলেও এই ব্যাপারে কোনো সাংগঠনিক ব্যাবস্থা নেয়নি সালাম রাঢ়ীর বিরুদ্ধে।
উন্নয়ন বঞ্চনার অভিযোগ: টানা ১৯ বছর পীর পরিবার চেয়ারম্যান পদে থাকলেও চরমোনাইবাসীর প্রধান অভিযোগ সেখানে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। ভিন্নমত অনুসারীদের নির্যাতন করার অভিযোগও আছে পীর পরিবারের বিরুদ্ধে।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স ইন্ড্রাসট্রিজের সহ সভাপতি চরমোনাই বাসিন্দা আমিনুর রহমান ঝান্ডা বলেন, ‘একটি কলেজ নেই ইউনিয়নে। পীর পরিবার তাদের মাদ্রাসা কেন্দ্রীক শিক্ষা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ইউনিয়নের বেশীরভাগ রাস্তা এখনও কাঁচা।’
অভিযোগ খণ্ডন করে বর্তমান চেয়ারম্যান সৈয়দ এছাহাক মো. আবুল খায়ের দাবি করেন, তার সময়েই চরমোনাইতে প্রথম পিচ ঢালাই রাস্তা, পাঁচটি সাইক্লোন সেল্টার ও অসংখ্য সেতু হয়েছে। সরকারের বরাদ্ধ অনুযায়ী উন্নয়ন করা হয়েছে। অবকাঠামোর উন্নয়নের চেয়ে বড় উন্নয়ন করেছেন মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠন করে।
