ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

উদ্যোগ

কাঠমিস্ত্রি আনোয়ারের স্বপ্ন বাল্যবিয়েমুক্ত বাংলাদেশ

কাঠমিস্ত্রি আনোয়ারের স্বপ্ন বাল্যবিয়েমুক্ত বাংলাদেশ
×

সৌমিত্র শীল চন্দন, রাজবাড়ী

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:২৭

সবকিছুই লাল রঙের। পরনে তার লাল পোশাক। সাইকেল থেকে শুরু করে সামনে থাকা সাইনবোর্ডের রংও লাল। সাইকেলে স্ট্যান্ড লাগিয়ে ঝোলানো রয়েছে লাল পতাকা। আর এর ওপর দেশের লাল-সবুজ পতাকা। জামার বাঁপাশে লেখা- 'বাল্যবিয়েকে না বলুন।' আর ডানপাশে লেখা- 'বাল্যবিয়েকে লাল কার্ড দেখান।' বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করতে সাইকেল চালিয়ে এমনই ভাবে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত ঘুরছেন আনোয়ার হোসেন তালুকদার। সাইকেলের সামনে থাকা ছোট্ট সাইনবোর্ডে তার পরিচয়ের সঙ্গে আরও লেখা রয়েছে, 'হতে চাই না বিয়ের পাত্রী, হতে চাই স্কুলছাত্রী' স্লোগান। পঞ্চাশোর্ধ্ব আনোয়ার হোসেন পেশায় কাঠমিস্ত্রি। তিনি বগুড়া সদর উপজেলার নিশিন্দারা ইউনিয়নের বারবাকপুর গ্রামের বাসিন্দা।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সামনে আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, বাল্যবিয়েমুক্ত দেশ গড়াই তার স্বপ্ন। অকালে যেন কোনো ছাত্রী ঝরে না পড়ে। কারও যেন অকাল মৃত্যু না হয়।

সাইকেল চালিয়ে এরই মধ্যে দেশের ৬৪টি জেলা ও ২২৭টি উপজেলা পরিভ্রমণ করেছেন। বাকি উপজেলাগুলোয় প্রচারিভাযানের অংশ হিসেবে এখন তিনি রাজবাড়ীতে। বাল্যবিয়ে সমাজের জন্য খারাপ, তাই এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে তিনি লাল পোশাক বেছে নিয়েছেন।

কেন এই উদ্যোগ জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন জানান, তার ভাগ্নির বাল্যবিয়ে হয়েছিল। মাত্র ১৪ বছর বয়?সে সন্তান হওয়ার পর স্বামী তার ভাগ্নিকে ছেড়ে? দেয়। এরপর ভগ্নিপতি (ভাগ্নির বাবা) সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে ওই পরিবা?রের করুণ পরিণতি দেখে বাল্যবিয়ে রোধ ও জনগণ?কে স?চেতন কর?তে ২০১৫ সা?লের মা?র্চে তার দোকান বি?ক্রি ক?রে সাই?কেল নি?য়ে দেশ ভ্রমণ শুরু করেন। মাত্র ৬৭ দিনে তিনি ৬৪ জেলা ভ্রমণ ক?রেন। জেলা পর্যায় শে?ষে এখন উপজেলা পর্যায় ভ্রমণ করে বাল্যবিয়ে রোধ ও এর কুফল সম্পর্কে লিফলেট বিতরণ কর?ছেন। তিনি বলেন, বাল্যবিয়ের কারণে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই জীবনের ঝুঁকি বাড়ে। সন্তান প্রসবের সময় অনেক প্রসূতি মৃত্যুবরণ করে। এ ছাড়া পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহও বাল্যবিয়ের অন্যতম কারণ। তার মতে, এসব নানা কারণে বাল্যবিয়ে বন্ধ হওয়া সময়ের দাবি।

আনোয়ার হোসেনের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। বড় ছেলে আসিফ পেশায় ব্যবসায়ী। ছোট ছেলে আব্দুল্লাহ তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। তবে ১১ বছর আগে যখন বড় মেয়ের বিয়ে দেন তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর। এজন্য তিনি ভীষণ অনুতপ্ত। আনোয়ার হোসেন জানান, তখন তিনি বাল্যবিয়ের ভালো-মন্দ বুঝতেন না, তাই ভুল করেছেন। তবে ছোট মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন ২০ বছর বয়সে।

আনোয়ার হোসেন আরও বলেন, বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে যখন লাল পোশাক পরে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন, তখন অনেকেই তাকে পাগল বলেছিল। এমনকি তার এলাকা নিশিন্দারা ইউপি চেয়ারম্যানও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। পরে যখন সবাই তাকে বাহ্বা দিতে শুরু করলেন, তখন ইউপি চেয়ারম্যান তাকে সংবর্ধনা দেন।

এ পর্যন্ত নিজে চারটি বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছেন আনোয়ার হোসেন। কয়েক বছর আগে তার এলাকার ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীর বিয়ের আয়োজনের কথা শুনে শিশুটির পরিবারের কাছে গিয়ে বিয়েটি বন্ধ করার অনুরোধ করেন; কিন্তু তাদের কেউ সেই কথায় কর্ণপাত করেনি। তখন তিনি উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে বিষয়টি জানান। তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিয়েটি বন্ধ করে। তবে এলাকায় কারও বিয়ে বন্ধ করলে শত্রু হতে হয়। এজন্য প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাকে বলেছেন, বাল্যবিয়ের খবর পেলে ফোন করে জানাতে। আর তার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বলেন। বাল্যবিয়ের খবর পেলেই প্রশাসন ও পুলিশকে জানান। তিনি বলেন, স্ত্রী পারভীন আক্তার ও বড় ছেলে এ কাজে আমাকে খুবই উৎসাহিত করে।

আনোয়ার হোসেন জানান, তিনি যে উপ?জেলায় যান সেখানকার জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তার থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা ক?রে দেন। এ ছাড়া লিফলেটের খরচসহ অন্যান্য খরচ এখন তার ছে?লে দেন। ভ্রমণ কর?তে এখনও সরকারিভা?বে কোনো আর্থিক সহযোগিতা পান?নি। শুধু ইউ?নি?সে?ফের একটি প্রোগ্রাম করে তিন মাসে ৭২ হাজার টাকা পে?য়ে?ছি?লেন। উপ?জেলা পর্যায় ভ্রমণ শেষে ইউ?নিয়ন পর্যায় ভ্রমণ করার ইচ্ছা আছে। তিনি মনে করেন, যে পরিবার বাল্যবিয়ে দেবে বা আয়োজন করবে, তাদের স্মার্টকার্ড বাতিল করে দিতে হবে। তাহলে তারা সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাবে না। সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে তখন আর কেউ বাল্যবিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেবে না।

আরও পড়ুন

×