বন্দরনগরীতে নানা হিসাব
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:২৯
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে আগের মেয়র আতিকুল ইসলামের ওপর ফের
আস্থা রাখলেও দক্ষিণে আগের মেয়র সাঈদ খোকনকে বাদ দিয়ে নতুন প্রার্থী
ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসকে বেছে নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ঢাকার
পরপরই অনুষ্ঠিত হবে চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন। ঢাকার প্রার্থী বাছাই থেকে
তাই বার্তা খুঁজছে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগও। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)
কেএম নূরুল হুদা মার্চে চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়ায়
সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা কষছেন নানা হিসাব। মেয়র প্রার্থী হিসেবে এবারে
নতুন মুখ নাকি ফের আ জ ম নাছিরের ওপর আস্থা রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনা- সেটি নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগে মেয়র পদে
সম্ভাব্য প্রার্থী আছেন অনেক। বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির এবারও মনোনয়ন
চাইবেন। গত সাড়ে চার বছরে দুর্নীতির বা স্বজনপ্রীতির কোনো অভিযোগ ওঠেনি তার
বিরুদ্ধে। এই সময়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন
করে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন
তিনি। তাই তার অনুসারীরা মনে করছেন প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য প্রার্থীদের তুলনায়
মনোনয়ন দৌড়ে অনেক এগিয়ে আছেন বর্তমান মেয়র। তবে আওয়ামী লীগের আরেকটি অংশ
মনে করছে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনের মতো দলীয় কোন্দল বাধা হতে পারে
চট্টগ্রামের বর্তমান মেয়রের জন্য। তাদের ধারণা, ঢাকা দক্ষিণের মতো
চট্টগ্রামেও নতুন প্রার্থী বেছে নিতে পারে দল। এজন্য তারা এগিয়ে রাখছেন
সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সন্তান ও বর্তমান শিক্ষা উপমন্ত্রী
ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে। আওয়ামী লীগের আগের কমিটিতে
সাংগঠনিক সম্পাদকের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও সদ্য গঠিত কমিটিতে নওফেলকে
কোনো পদ দেওয়া হয়নি। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন তিনি। এজন্য
মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে এ তরুণ নেতাকে দেখা যেতে পারে বলে গুঞ্জন
আছে। অবশ্য নওফেল নিজে মেয়র পদে আগ্রহী নন বলে জানা গেছে। তারপরও দলের
সিদ্ধান্তে হয়তো শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হিসেবে দেখা যেতে পারে তাকে। প্রয়াত
মহিউদ্দিন চৌধুরীর ব্যক্তি ইমেজকে নওফেল কাজে লাগাতে পারবেন বলে মনে করছেন
তার অনুসারীরা।
নওফেল প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে গেলে বাদ পড়বেন সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায়
থাকা নওফেলের মা হাসিনা মহিউদ্দিন। নগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতির
দায়িত্বে আছেন তিনি। প্রকাশ্যে না বললেও দলীয় মনোনয়ন পেলে মেয়র পদে
নির্বাচন করতে আগ্রহী হাসিনা মহিউদ্দিন। ছেলে নওফেল আগ্রহী না হলে হাসিনা
মহিউদ্দিন এগিয়ে আসবেন। দল নওফেলকে বেছে নিলে পিছু হটবেন তিনি।
এদিকে, প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে দল ও সরকারকে আলাদা করার প্রভাব
চট্টগ্রামে পড়লেও এবার হতে পারে নতুন সমীকরণ। আ জ ম নাছির উদ্দীন একাধারে
মেয়র আবার নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও। গুরুত্বপূর্ণ এ দুটি পদে থেকে
এখন সংগঠন পরিচালনা করছেন তিনি। দল ও সরকারকে আলাদা করার বিষয়টি বিবেচনায়
এলে একটি রেখে অন্যটি ছাড়তে হবে নাছিরকে। একই সমস্যায় পড়বেন দলের অপর
সম্ভাব্য প্রার্থী খোরশেদ আলম সুজন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কতৃপক্ষের (সিডিএ)
সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। খোরশেদ আলম সুজন নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি
পদে আছেন। আবদুচ ছালাম আছেন কোষাধ্যক্ষ পদে। মেয়র পদে মনোনয়নের জন্য বেছে
নেওয়া হলে তাদেরও হারাতে হতে পারে দলীয় পদ। তারপরও মনোনয়ন নিয়ে আশাবাদী
তারা। চট্টগ্রাম-৮ উপনির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন আবদুচ ছালাম। টানা ১০
বছর সিডিএ চেয়ারম্যান থাকলেও এমপি পদে দলের মনোনয়ন পাননি তিনি। তার
অনুসারীরা মনে করছেন মেয়র পদে দলের পরিকল্পনায় আছেন বলেই হয়তো উপনির্বাচনে
বিবেচনা করা হয়নি ছালামকে।
আলোচনায় আছেন খোরশেদ আলম সুজনও। নগরীর বন্দর-পতেঙ্গা আসন থেকে একবার দলীয়
মনোনয়ন পেয়েও বঞ্চিত হয়েছেন তিনি। এবারও তাকে হতাশ করে এ আসনে দলীয় মনোনয়ন
দেওয়া হয়েছে বর্তমান এমপি এমএ লতিফকে। সুজনের অনুসারীরা মনে করছেন, এবার
হয়তো তাকে মূল্যায়ন করবে দল। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ নাগরিক বিভিন্ন সমস্যা
নিয়ে অনেকদিন ধরেই সরব আছেন খোরশেদ আলম সুজন। এটিকেই কেউ কেউ মনে করছেন
মেয়র নির্বাচনের প্রস্তুতি।
মেয়র পদে প্রার্থী হতে আগ্রহ আছে সাবেক সিটি মেয়র এম মনজুর আলমেরও। গতবার
বিএনপি থেকে মেয়র পদে নির্বাচন করলেও গত চার বছরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে
ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন তিনি। সর্বশেষ একাদশ সংসদ নির্বাচনে সীতাকুণ্ড আসন থেকে
আওয়ামী লীগের মনোনয়নও পান তিনি। কিন্তু ভাতিজা দিদারুল আলমের স্থলে
নির্বাচন করতে রাজি হননি মনজুর আলম। তিনি নগরীর ডবলমুরিং-পাহাড়তলী আসন থেকে
মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তার এ চাওয়াতে সম্মতি ছিল না দলের। তারপরও আওয়ামী লীগের
সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন মনজুর আলম। তাই আসন্ন মেয়র নির্বাচনে
আলোচনায় আছেন তিনিও। দলের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে না থাকায় দল থেকে সরকারকে
আলাদা করার যে ফর্মুলা নিয়ে হাঁটছে আওয়ামী লীগ, সেটি মনজুর আলমের পক্ষে
যেতে পারে।
দলীয় পরিচয়ের বাইরেও সম্ভাব্য প্রার্থী আছেন চট্টগ্রামে। ঢাকায় মেয়র পদে
আওয়ামী লীগের মনোনয়নই বিকল্প এ ধারাকে উৎসাহিত করছে। দলীয় পরিচয়ের বাইরে
ব্যবসায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করতে আগ্রহী চিটাগাং চেম্বার অব
কমার্সের সভাপতি মাহবুবুল আলম। টানা তিনবার চিটাগাং চেম্বারের সভাপতি
হয়েছেন তিনি। খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনেও সভাপতির
দায়িত্ব পালন করছেন মাহবুবুল আলম। এই ব্যবসায়ী নেতা আবার চট্টগ্রাম
বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনেরও সাধারণ সম্পাদক। তার জন্য নীরবে
কাজ করছেন মন্ত্রী ও এমপি পদে থাকা চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক নেতারা।
ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও বন্দর-পতেঙ্গা আসনের এমপি এমএ
লতিফ নেপথ্যে মাহবুবুল আলমের পক্ষে কাজ করছেন বলে আলোচনা আছে ভোটের মাঠে।
এদিকে, আওয়ামী লীগে একাধিক শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও বিএনপির চিত্র
একেবারে বিপরীত। নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রামে বিএনপির
অটোম্যাটিক চয়েজ হতে পারেন। দল চূড়ান্ত না করলেও চট্টগ্রামে ডা. শাহাদাতের
শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই বিএনপিতে। সাবেক মেয়র মীর মোহাম্মদ নাছির
উদ্দিন আলোচনায় থাকলেও সম্প্রতি দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হওয়ায় কিছুটা
বেকায়দায় আছেন তিনি। আবার চট্টগ্রাম-৮ উপনির্বাচনে নগর বিএনপির সহসভাপতি
আবু সুফিয়ান দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় মেয়র পদে ডা. শাহাদাতের মাঠ আরও পরিস্কার
হয়েছে বলে ধারণা করছেন তার অনুসারীরা।
- বিষয় :
- বন্দরনগরীতে নানা হিসাব
