সমকাল এক্সপ্লেইনার
ফিলিস্তিনিদের কি সোমালিল্যান্ডে পাঠাবে ইসরায়েল
সোমালিয়ার বিচ্ছিন্ন অঞ্চল সোমালিল্যান্ডে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের ‘পরিকল্পনা’ আছে ইসরায়েলের। ইলাস্ট্রেশন: সমকাল
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৭:১৫ | আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ২২:২০
চলতি বছরের মার্চে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, গাজা উপত্যকা থেকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের জন্য পূর্ব আফ্রিকার তিনটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
সম্ভাব্য ওই তিনটি দেশের নাম হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল সুদান, সোমালিয়া এবং সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডের কথা। গত শুক্রবার ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে। এরপর থেকেই বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের সোমালিল্যান্ডে স্থানান্তরের সন্দেহ তীব্র হয়েছে।
ইসরায়েলই প্রথম দেশ যারা সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমন পদক্ষেপ খালি চোখে সাধারণ মনে হলেও এর ভূরাজনৈতিক প্রভাব বেশ গভীরে।

সোমালিল্যান্ডের নিকটবর্তী দেশ ইয়েমেন। যেখানে ঘাঁটি ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের। যারা প্রায়ই গাজায় আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানাতে লোহিত সাগরের জাহাজে হামলা চালায়। আবার ইউরোপ ও এশিয়ার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক যোগাযোগের অন্যতম পথও লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর। সোমালিল্যান্ড ঠিক এই কৌশলগত স্থানেই অবস্থিত। ফলে সোমালিয়ার এই বিচ্ছিন্ন অঞ্চলকে ইসরায়েলের স্বীকৃতি দেওয়াটা নিছক সাধারণ ঘটনা নয়।
প্রশ্ন উঠছে, অঞ্চলটিকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে ইসরায়েলের বৃহত্তর স্বার্থ কী? ফিলিস্তিনিদের সেখানে স্থানান্তরের সম্ভাবনা কতটুকু? স্থানান্তর নিয়ে সোমালিয়া ও সোমালিল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ কী বলছে? উত্তরে যাওয়ার আগে সোমালিল্যান্ডের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে জানা যাক।
সোমালিল্যান্ড কোথায়
স্বঘোষিত সোমালিল্যান্ড প্রজাতন্ত্র এডেন উপসাগরের ধারে অবস্থিত। এই উপসাগরকে বলা হয় পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের সবচেয়ে ব্যস্ততম রুট। এই রুট এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যকে যুক্ত করেছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার জাহাজ এডেন উপসাগর অতিক্রম করে সুয়েজ খালের দিকে যাতায়াত করে। প্রতি মাসে এই পথে বহন করা হয় কয়েক মিলিয়ন টন অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য, গ্যাস এবং শস্য, লোহা খনিজ ও কয়লার মতো শুকনো পণ্য। এসব জাহাজে সোমালি জলদস্যুদের হামলার খবরও নিয়মিত গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়।
যেভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা
সোমালিল্যান্ড সরকারের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, তাদের ইতিহাস বহু পুরোনো। যেটির শুরু হয় ১৬শ শতকের মাঝামাঝিতে। অটোমান সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে তখন সেখানে বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে। ১৮৩৯ সালে ব্রিটেন এডেন ও ইয়েমেনে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করলে সোমালিল্যান্ড তাজা মাংস সরবরাহের উৎসে পরিণত হয়।
১৮৮৪-১৮৮৬ সালে ব্রিটিশ সরকার ও সোমালির তৎকালীন নেতাদের মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়। রাণী এলিজাবেথের ঘোষণা অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের ২৬ জুন তারা ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। একই বছরের ১ জুলাই ইতালীয় সোমালিয়ার সঙ্গে ঐচ্ছিকভাবে যুক্ত হয়ে সোমালি প্রজাতন্ত্র গঠন করে।
নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম সোমালিয়ায় অবস্থিত সোমালিল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। ১৯৯১ সালে সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধ ও বিশৃঙ্খলার প্রেক্ষাপটে তারা স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। এরপর থেকে সোমালিল্যান্ডের নেতারা স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। অঞ্চলটি সোমালিয়ার তুলনায় শান্তিপূর্ণ হলেও এতদিন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি।
ইসরায়েল কেন স্বীকৃতি দিল
ইসরায়েলের স্বীকৃতি দেওয়া এবং বিনিময়ে তারা কি চাইছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক গণমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল লিখেছে, তেল আবিবের এই পদক্ষেপ তাদেরকে মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে। বিশেষ করে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের কাছে। সোমালিল্যান্ড ও এডেন উপসাগরের ঠিক বিপরীত পাশেই হুতিদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ইয়েমেনের অবস্থান।

‘ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নেয়ার-ইস্ট পলিসি’ এর মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া প্রকল্পের পরিচালক ডেভিড মাকোভস্কি মনে করছেন, হুতিদের মোকাবিলায় সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েল সম্ভবত নতুন সামরিক সুবিধা পেতে যাচ্ছে।
হুতি বিদ্রোহী ও ইসরায়েলের সংঘাত দীর্ঘদিনের। বছরের বেশিরভাগ সময়ই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা চালায়। হুতিদের আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য থাকে লোহিত সাগরে চলাচল করা জাহাজ। তাদের দাবি, গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে তারা এসব হামলা করে।
ইসরায়েলের স্বীকৃতির উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইঙ্গিত পাওয়া যায় হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রধান আবদেল-মালিক আল-হুতির দেওয়া বিবৃতিতে। সতর্ক করে তিনি বলেছেন, ‘সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলের যেকোনো উপস্থিতিকে ‘সামরিক লক্ষ্যবস্ত’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কারণ এটি সোমালিয়া ও ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের শামিল এবং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।’ অর্থ্যাৎ হুতি বিদ্রোহীদের দমনের বিষয়টি ইসরায়েলের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।
ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের সম্ভাবনা
ফিলিস্তিনিদের বৃহৎ পরিসরে স্থানান্তরের ধারণা এক সময় ইসরায়েলের ‘চরম জাতীয়তাবাদীদের ফ্যান্টাসি’ হিসেবে বিবেচিত হত। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসের এক বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই ধারণার কথা বলেন। এরপর থেকেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্থানান্তরের পরিকল্পনাকে সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা শুরু করেন।

ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের গোপন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে গত মার্চে এপি তাদের প্রতিবেদনে লিখেছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা সোমালিয়া ও সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। পাশাপাশি আমেরিকান কর্মকর্তারা সুদানের অন্তর্ভুক্তিও নিশ্চিত করেছেন। তবে এই প্রচেষ্টাগুলো কতদূর অগ্রসর হয়েছে বা আলোচনার স্তর কোন পর্যায়ে আছে তা স্পষ্ট নয়।
এপির ওই প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছিলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে গাজা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরুর কয়েক দিন পর ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের সম্ভাব্য গন্তব্যগুলোর সঙ্গে পৃথকভাবে যোগাযোগ শুরু হয়। ওই আলোচনায় নেতৃত্ব দেয় ইসরায়েল।
সোমালিল্যান্ড ও সোমালিয়া যা বলছে
ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন সোমালিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, সোমালিল্যান্ডের কর্তৃপক্ষের ভাষ্য তারা এমন কোনো প্রস্তাব পায়নি। ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে কারও সঙ্গে কোনো আলোচনাও হয়নি।

আর সোমালিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ মোলিম ফিকি বলেছেন, তারা প্রথমত ইসরায়েলের সোমালিল্যান্ড স্বীকৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তর বা তাদের (সোমালিয়ার) ভূখণ্ডে পুনর্বাসনের যেকোনো আলোচনাও গ্রহণ করবে না।
তবে আহমেদ মোলিম ফিকি অভিযোগ করেছেন, এই ‘জঘন্য’ কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে সোমালিল্যান্ডের নেতারা আছেন।
আর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে বলেছে, ইসরায়েল আগেও গাজার বাস্তুচ্যুতদের স্থানান্তরের গন্তব্য হিসেবে ‘সোমালিল্যান্ড’ নামটি ব্যবহার করেছে। পৃথক বিবৃতিতে নিন্দা জানিয়েছে হামাসও।
যুক্তরাষ্ট্র যা বলছে
বিভিন্ন দেশ যখন সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার নিন্দা জানিয়েছে তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এখনই ইসরায়েলের পথে হাঁটছেন না।
নিউইয়র্ক পোস্টকে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি নিয়ে যাচাই-বাছাই করছে। সবকিছু ‘স্টাডির’ পর্যায় আছে। যুক্তরাষ্ট্র অনেক কিছু স্টাডি করে এবং তাদের সিদ্ধান্ত সবসময় সঠিক প্রমাণিত হয়।
