ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রকৃতি

কাষ্ঠল লতা বানরকলা

কাষ্ঠল লতা বানরকলা
×

মধুপুর বনের গভীরে বানরকলা লতায় ফুল- রাতুল মুন্সী

চয়ন বিকাশ ভদ্র

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৪ | আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ঘন প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, পাহাড়ি টিলা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের কোলজুড়ে বাস করে বৈচিত্র্যময় অসংখ্য বুনো উদ্ভিদ। এর অনেকগুলোর রূপ, ঘ্রাণ এবং ঔষধি গুণ আমাদের মোহিত করার পাশাপাশি অবাকও করে। এমনই একটি চমৎকার ও বিরল প্রজাতির কাষ্ঠল লতাজাতীয় উদ্ভিদ হলো বানরকলা।

শুধু মধুপুরে নয় আমাদের দেশের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, চকরিয়া ও শেরপুরের গজনীর বনাঞ্চলসহ ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনেও এ উদ্ভিদের দেখা মেলে।

বানরকলার বৈজ্ঞানিক নাম Uvaria hamiltonii, ইংরেজিতে এটি Eastern Uvaria নামে পরিচিত। উদ্ভিদজগতের Annonaceae অর্থাৎ আমাদের সুপরিচিত আতা ও শরিফা পরিবারেরই সদস্য এই উদ্ভিদ। বাংলাদেশ ছাড়াও পূর্ব হিমালয়, নেপাল, উত্তর-পূর্ব ভারত, আন্দামান, উড়িষ্যা, মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের ৩০০ থেকে ৬০০ মিটার উচ্চতার আর্দ্র বনাঞ্চলে এর প্রাকৃতিক উপস্থিতি রয়েছে।

বানরকলা মূলত এক ধরনের বিশাল কাষ্ঠল আরোহী লতা। শক্ত ও দীর্ঘ লতার সাহায্যে বড় বড় গাছ পেঁচিয়ে এরা ১০ থেকে ১৫ মিটার কিংবা এর চেয়েও বেশি উঁচুতে উঠে যায়। এর পাতা সরল, একান্তর এবং ডিম্বাকার-আয়তাকার বা উপবৃত্তাকার। পাতার ডাঁটায় নরম পশমের মতো কোমল আবরণ থাকে। পাতার মধ্যশিরা বেশ উন্নত এবং জালিকা শিরাবিন্যাসযুক্ত।

মে থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে ফুল ফোটে। উজ্জ্বল গাঢ় লাল রঙের ফুল অত্যন্ত মনকাড়া। ফুলগুলো উভলিঙ্গিক। এতে ছয়টি বৃত্তাংশ থাকে, যার মধ্যে তিনটির বাইরের অংশ কিঞ্চিৎ বাদামি ও প্রান্ত ভোঁতা। চর্মবৎ পুরু ও শক্ত ছয়টি পাপড়ি দুই আবর্তে বিন্যস্ত থাকে, যাদের প্রান্তভাগ ভেতরের দিকে বাঁকা এবং ডগার উভয় পাশে বাদামি রোঁয়ার মতো আবরণ থাকে। ফুলে অসংখ্য পুংকেশর থাকে এবং এতে গোলাপের মতো মৃদু ও মিষ্টি সুবাস পাওয়া যায়।

ফল থোকা থোকা বা গুচ্ছবদ্ধ অবস্থায় থাকে। পাকলে লাল রঙ ধারণ করে। এর তুলতুলে নরম পাত্র বা বাকল সরালেই ভেতরে রসালো অন্তত্বক পাওয়া যায়, যা হালকা টক-মিষ্টি স্বাদের। রসালো এই অংশের স্বাদ অনেকটা লটকন বা লিচুর কথা মনে করিয়ে দেয়, যার কারণে কোনো কোনো অঞ্চলে এটি স্থানীয়ভাবে লটকন নামেও ডাক পায়। ফলের ভেতরে আতা ফলের মতোই বেশ কয়েকটি শক্ত কালো বীজ থাকে।

বানরকলা কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বনের খাদ্যশৃঙ্খল ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর অবদান অনেক।  বনাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বনের বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে বানর, পাখি ও ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর অন্যতম প্রিয় খাবার এই ফল। মধুপুর, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ শহরে এই ফল বিক্রি হতে দেখেছি। 

স্থানীয় বৈদ্য ও বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে এর মূল ও কাণ্ডের ভেষজ ব্যবহার রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে এটি জ্বর, জন্ডিস ও পেটের পীড়া নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গবেষণাগারে এটি নিয়ে বায়োমেডিকেল গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। এতে বিভিন্ন ধরনের কার্যকর স্টেরয়েডস এবং অ্যালকালয়েডস পাওয়া গেছে, যা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান হিসেবে কাজ করে। 

লেখক:  উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক 

আরও পড়ুন

×