নিরাপদ ও মানসম্মত মাছ উৎপাদনে জোর, রপ্তানি বাড়ানোর আহ্বান কৃষিমন্ত্রীর
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে মৎস্যসম্পদ: বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ১১:২৮ | আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ১২:০০
বিশ্বে খাদ্যের অভাবের চেয়ে নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্যের চাহিদা এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেছেন, দেশের মৎস্য উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাড়াতে হবে। সোমবার বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) আয়োজনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে মৎস্যসম্পদ: বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মৎস্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে মাছের কী কী সমস্যা রয়েছে, ভবিষ্যতে সম্ভাবনা কোথায়, মানুষের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মানসম্মত মাছের চাহিদা কী—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করা গেলে মৎস্য খাত দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবে।
তিনি বলেন, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে পর্যাপ্ত অভয়াশ্রম নিশ্চিত করা জরুরি। মাছ সংরক্ষণে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার ব্যবহারসহ বিভিন্ন পরিবেশগত চাপ মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে পরিবেশসম্মত ও আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতির দিকে যেতে হবে। সীমিত জায়গায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেশি মাছ উৎপাদনের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মৎস্যপণ্যের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে দেশের মিঠাপানির মাছের বড় বাজার রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব। তবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে হলে শুধু বাংলাদেশিরা যে মাছ খায়, তা উৎপাদন করলেই হবে না। যে দেশে মাছ রপ্তানি করা হবে, সেই দেশের মানুষের পছন্দ ও চাহিদা অনুযায়ী মাছ উৎপাদনের দিকেও নজর দিতে হবে।
চিংড়ি, কাঁকড়া, কুচিয়াসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর রপ্তানি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এসব ক্ষেত্রে উৎপাদনের পাশাপাশি পোনা উৎপাদন ও প্রজননব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে পোনা উৎপাদন ও লালন-পালন করা গেলে উৎপাদন ও রপ্তানি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
মৎস্য উৎপাদনে গুণগত মান, নিরাপদ খাদ্য, পরিবেশ সুরক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে বিজ্ঞানী, গবেষক ও পেশাজীবীদের কার্যকর পরামর্শ সরকারকে সহযোগিতা করবে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, মাছের উৎপাদন বাড়াতে হলে মাছের বেড়ে ওঠা ও প্রজননের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নদী-নালা দখল, নাব্যতা সংকট এবং শিল্পকারখানার বর্জ্যে পানিদূষণের কারণে মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি সূত্রেও তাঁকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মাছের আবাসস্থল ফিরিয়ে আনতে নদী ও খালের নাব্যতা বজায় রাখা এবং নদীর সঙ্গে খালের সংযোগ পুনঃস্থাপন জরুরি। প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী পুনঃখননের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মাছের প্রজনন ও বিচরণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মাছ চাষে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে একদিকে খামারিরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে খাদ্যনিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়ছে। এ বিষয়ে খামারিদের সচেতন করতে জেলাভিত্তিক সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিএফআরআইয়ের মহাপরিচালক ড. মো. লতিফুল ইসলামের সভাপতিত্বে সেমিনারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিএফআরআইয়ের বিজ্ঞানীরা উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফআরআইয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মশিউর রহমান।