জনশুমারি বিশ্লেষণ
সঠিক পরিকল্পনায় সম্পদ হতে পারে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী
ড. মো. আমিনুল হক
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৩ | ০৭:১৬
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনার সমন্বয়কৃত ফলাফল প্রকাশ করেছে। আমরা দেশের মোট জনসংখ্যাসহ বিভিন্ন বয়স কাঠামোর জনগোষ্ঠীর সংখ্যা জানতে পেরেছি। যেমন নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সংখ্যা, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা, নারী-পুরুষের সংখ্যা, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা, তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা; শারীরিক প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গসহ বিভিন্ন ধরনের তথ্য পেয়েছি। এ তথ্য আমাদের দেশের গবেষক, নীতিনির্ধারক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, ছাত্রসহ সর্বস্তরের মানুষের আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।
দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ ৮ কোটি ৪০ লাখ, যা মোট জনগোষ্ঠীর ৪৯ দশমিক ৫১ শতাংশ। নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৫৬ লাখ ৫৩ হাজার ১২০। অর্থাৎ মোট জনগোষ্ঠীর ৫০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। পুরুষের তুলনায় নারী ১৫ লাখ ৭৫ হাজার ৯১৭ বেশি; দশমিক ৯২ শতাংশ। দেশে বর্তমানে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪ কোটি ৭৪ লাখ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর; মোট জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, মোট জনগোষ্ঠীর ৬২ শতাংশ অর্থাৎ ১০ কোটি ৫০ লাখ কর্মক্ষম, যাদের বয়স ১৫ থেকে ৫৯ বছর। গত ২০১১ সালের জনশুমারি থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫ শতাংশ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেড়েছে। দেশে নির্ভরশীল (০-১৪ বছর বয়সী এবং ৬০+ জনগোষ্ঠী) জনগোষ্ঠীর হার কম হলেও (৩৮ শতাংশ) প্রবীণ জনসংখ্যা বেড়েছে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ; ১ কোটি ৯৮ লাখ।
ওপরের এসব তথ্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে; চিন্তার খোরাক তৈরি করেছে; পুরোনো ভাবনাকে ত্বরান্বিত করেছে এবং নতুন ভাবনার প্রয়োজনীয়তা দেখিয়েছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একজনের এক দিনের শ্রমমূল্য যদি ৫০০ টাকা হয়, তাহলে ১০ কোটি ৫০ লাখ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর এক দিনের শ্রমের মূল্য ৫২৫০ কোটি টাকা এবং এক মাসের শ্রমমূল্য ন্যূনতম ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পক্ষান্তরে যদি কর্মে নিযুক্ত না থাকে তাহলে প্রতিদিন ৫২৫০ কোটি টাকার সুযোগ থেকে দেশ বঞ্চিত হবে।
আমরা বলছি, এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। কেউ বলছি, নীতিমালা তৈরি করতে হবে। সরকার দেশের সব কর্মপরিকল্পনার মধ্যে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। নীতিমালা বা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে যে সময় লাগবে, সেই পর্যন্ত ওই জনগোষ্ঠীর যদি বৃহৎ বা অর্ধেক বসে থাকে, তবে জনমিতিক লভ্যাংশের কী হবে? আমরা যদি এ জনগোষ্ঠীকে ৪৬০টি উপজেলা বা ৩০০টি সংসদীয় আসন দিয়ে ভাগ করি তাহলে দেখা যাবে, উপজেলাপ্রতি ২ লাখ ৩০ হাজার এবং প্রতি সংসদীয় আসনে সাড়ে ৩ লাখ কর্মক্ষম লোক বাস করে। একজন সংসদ সদস্যকে তাঁর নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর কর্মে যুক্ত হওয়ার বিষয় চিহ্নিত করতে হবে। একইভাবে ব্যক্তি ও পরিবারকে তাঁর সন্তানদের কর্মে নিযুক্ত করার বিষয়ে বাস্তবসম্মত চিন্তা করতে হবে। বিশাল জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে হলে চাকরি, ব্যবসা ও উদ্যোগে যুক্ত করা এবং বিদেশে পাঠানোর সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন দরকার। দেশের বর্তমান স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গামী অনেকেরই কৃষির সঙ্গে সম্পর্ক খুব কম। ব্যবসা করার কৌশলও জানা নেই; উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নেই অনেকের। আবার উপযুক্ত প্রশিক্ষণও নিচ্ছে না ।
দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা যাবে, ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ সাধারণ বা মাদ্রাসা মাধ্যমে পড়াশোনা করে বা করছে। সর্বসাধারণের মধ্যে দেশে কারিগরি পড়াশোনা তেমন ব্যাপকতা লাভ করেনি। সাধারণ মাধ্যমে পড়াশোনা করে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন যদি না হয়, তাহলে শিক্ষার কৌশল নিয়ে নতুন দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দেশের বৃহৎ স্বার্থে সেবামূলক কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনকল্যাণকর কাজে নিযুক্ত করে দেশের প্রভূত কল্যাণ আনা সম্ভব। যেমন ঢাকা শহরের আনাচ-কানাচ যদি পরিষ্কার করা যায় তাহলে দেশের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি হবে।
ভাবতে হবে, বিশাল এ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য বাংলাদেশ কি পারবে উপযুক্ত কর্মের জোগান দিতে? নাকি বৃহৎ অংশকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে রপ্তানি করতে হবে? এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ১০ শতাংশের যদি রপ্তানির পরিবেশ সৃষ্টি করা যায় তাহলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় অনেক বাড়বে। দেশের ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীও নতুন সব ভাবনার জন্ম দিয়েছে। ষাটোর্ধ্ব অনেক ব্যক্তি এখনও কর্মক্ষম। এসব ব্যক্তির মধ্য থেকে সমাজের সেবামূলক কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে। এ জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও স্বাস্থ্যসেবা সাধ্যমতো পূরণের কৌশল ও পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবীণদের জন্য সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রবীণদের জন্য সেবা প্রদানে সমাজের তরুণদের আগ্রহী করে তুলতে হবে। রাষ্ট্রের সঙ্গে সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিকেও প্রবীণদের নিয়ে ভাবতে হবে।
লেখক : অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
