ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আইএমএফের আপত্তি সত্ত্বেও ভর্তুকি বাড়াচ্ছে সরকার

আইএমএফের আপত্তি সত্ত্বেও ভর্তুকি বাড়াচ্ছে সরকার
×

 মেসবাহুল হক 

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ০৮:১২ | আপডেট: ১১ মে ২০২৬ | ১৮:৫৪

ভর্তুকি কমাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপ থাকলেও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনার পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তির সময় ভর্তুকি কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রতিবছরই এ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ মূল বরাদ্দ ছিল এক লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে তা বাড়িয়ে এক লাখ ১৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দ কমিয়ে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা করা হয়। সেই হিসাবে সংশোধিত বাজেটের তুলনায় আগামী বাজেটে বরাদ্দ বাড়ছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ বিভাগের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নেও অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন হবে।

২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার পর উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিভিন্ন খাতে বেশি ভর্তুকি দেওয়া কঠিন হবে। যদিও এলডিসি উত্তরণে আরও তিন বছর সময় চেয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে জোরালো পরামর্শ দিয়ে আসছে আইএমএফ।

গত মাসে অনুষ্ঠিত আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার-সংক্রান্ত সমন্বয় কাউন্সিল ও সম্পদ কমিটির বৈঠকে এসব অঙ্ক চূড়ান্ত করা হয়। একই বৈঠকে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার যৌক্তিকীকরণ নিয়ে আইএমএফের আপত্তি নিয়েও আলোচনা হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করে আইএমএফ। পরে ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৫৫০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে বাংলাদেশ ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়। এর অংশ হিসেবে জ্বালানি তেলের দাম বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নির্ধারণ শুরু হয় এবং ভর্তুকি কিছুটা কমানো সম্ভব হয়। তবে বিদ্যুৎ খাতে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এখনই এসব খাতে ভর্তুকি কমানো সম্ভব নয়। এ বিষয়গুলো নিয়ে আইএমএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

আগামী অর্থবছরেও সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে। এ খাতে ভর্তুকি বাবদ ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বাজেটেও একই পরিমাণ বরাদ্দ ছিল। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র যুক্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ আরও বাড়বে বলে সম্প্রতি অর্থ বিভাগকে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

এলএনজিতেও বাড়ছে 

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম অনেক বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়ও প্রয়োজনীয় এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে দুই থেকে তিন গুণ বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।

চলতি বাজেটে এ খাতে ছয় হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ থাকলেও গত এপ্রিল পর্যন্ত আট হাজার কোটি টাকা ছাড় করেছে অর্থ বিভাগ। চলতি মাসেই আরও অন্তত চার হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে। আগামী বাজেটে এ খাতে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এ ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।

সারে ভর্তুকি ২৭ হাজার কোটি টাকা

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য সরকার সারের দাম বাড়াতে চায় না। এ জন্য আগামী বাজেটে সারে মোট ২৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ব্যয় হবে ১৭ হাজার কোটি টাকা এবং বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারের অন্যান্য সার উৎপাদন ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যয় হবে। এই ১০ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ২৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি ‘অন্যান্য’ কোডে রাখা হচ্ছে।

অন্যান্য খাতে বরাদ্দ

স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ওএমএস, টিসিবি ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সারাবছর চালু রাখার চিন্তা থেকে আগামী অর্থবছরে খাদ্য ভর্তুকি বাবদ ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বাজেটেও একই পরিমাণ বরাদ্দ রয়েছে।

রপ্তানি প্রণোদনায় সাত হাজার ৮২৫ কোটি টাকা, প্রবাসী আয় আনার জন্য সাত হাজার কোটি টাকা এবং পাটজাত দ্রব্যে প্রণোদনা বাবদ এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি বিভিন্ন দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে নগদ ঋণ দেওয়ার জন্য মোট ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ মত

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি সমকালকে বলেন, ভর্তুকি কমানো গেলে অর্থনীতির জন্য লাভজনক হবে। কারণ, সাশ্রয় হওয়া অর্থ অন্য উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা যাবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্ব রাজনীতি ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সবকিছুর দাম বাড়ছে। দেশে মূল্যস্ফীতি গত মাসে ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে এবং আগামী মাসগুলোতেও এ প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে সব পণ্যের দাম বাড়ছে। এই অবস্থায় আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে স্বল্প আয়ের ও দরিদ্র মানুষের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। তাই যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। গত প্রায় তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ভর্তুকি কমানোর ফলে বাড়তি চাপ তারা কতটা সহ্য করতে পারবে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তির সময় বর্তমানের মতো অনিশ্চয়তা ছিল না। তাই এখনকার বাস্তবতার আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সেখানে জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। জনগণের স্বার্থে প্রয়োজন হলে আগের সিদ্ধান্তও পরিবর্তন করা উচিত। মুস্তফা কে মুজেরি আরও বলেন, ভর্তুকির চাপ কমাতে শুধু দাম বাড়ানোই সমাধান নয়। বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি, মিটার টেম্পারিং ও সিস্টেম লস কমাতে হবে। বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ করা গেলে ভর্তুকির প্রয়োজনও কমে আসবে এবং সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম সমকালকে বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো বা সরকার থেকে ভর্তুকি দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। গত ১৫ বছরে এ খাতে যে ব্যাপক লুণ্ঠন হয়েছে, তা বন্ধ করতে পারলেই অধিকাংশ সমস্যার সমাধান সম্ভব। তাঁর মতে, জ্বালানি খাতে যারা লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িত, তারা ‘জ্বালানি অপরাধী’। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্ভব হলে জ্বালানি খাতের অপরাধীদের বিচারও সম্ভব হওয়া উচিত। এ খাতের অনিয়ম ও লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

আরও পড়ুন

×