বাণিজ্যচুক্তি নয়, এটি মার্কিন প্রশাসনের হুকুমনামা: আনু মুহাম্মদ
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ | ১৭:৫০
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তির কঠোর সমালোচনা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেছেন, বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি আদৌ সাধারণ বাণিজ্যচুক্তির মধ্যে পড়ে কি না তা ভাববার বিষয়। এটিকে বাণিজ্যচুক্তি বলাও যায় না। এটি মূলত মার্কিন প্রশাসনের একটি হুকুমনামা। যাতে বাংলাদেশ কী কী করতে বাধ্য থাকবে, তা একতরফাভাবে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।
বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি: হুমকিতে দেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এসব কথা বলেন। বাম ও প্রগতিশীল ১৩টি দলের সমন্বয়ে গঠিত সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, এই বাণিজ্যচুক্তিতে ঘাটতি বাণিজ্যের যুক্তি দেখিয়ে বাংলাদেশকে বেশি দামে মার্কিন পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। যা সম্পূর্ণ অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক। চুক্তিটি পড়লে মনে হয় এখানে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ প্রবাদের চেয়েও বেশি বাধ্যবাধকতা। চুক্তিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধিবিধান বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বীকৃত নীতিমালার প্রতিফলনও নেই।
চুক্তি স্বাক্ষরের সময় নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের গরজ ও আগ্রহে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অথচ বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করানো যেত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতসহ বেশিরভাগ দেশ এ ধরনের চুক্তি এড়িয়ে গেছে বা আলোচনার স্তরে আছে। অনেক দেশ চুক্তি নিয়ে ভাবছে, সময় নিচ্ছে বা স্থগিত করেছে। অথচ বাংলাদেশ স্বেচ্ছায় এগিয়ে গিয়ে ও নিজ দায়িত্বে চুক্তি সম্পন্ন করেছে। যারা এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে তারা মূলত মার্কিন পক্ষেরই লোক।
নির্বাচিত সরকার এসেও চুক্তি অব্যাহত রেখেছে উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে গম, তুলা, মাছ বা মাংস আমদানি করতে হলে একদিকে রাজস্ব কমবে, অন্যদিকে ভর্তুকি বাড়বে। সেই বোঝা শেষপর্যন্ত জনগণের ঘাড়েই পড়বে। ওষুধ ও ডেইরিশিল্প, আইটি ও ই-কমার্স খাত এবং গ্যাস সম্পদ- সবকিছুই এই চুক্তির আওতায় ঝুঁকিতে পড়বে। কেননা বেশি দামে পণ্য আমদানি করলে তা দেশীয় বাজারে বিক্রি হবে না। ফলে সরকারকে সেখানে ভর্তুকি দিতে হবে এবং রাষ্ট্র রাজস্ব হারাবে। যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে সাধারণ জনগণের ওপর।
গোলটেবিল বৈঠকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান চুক্তিটিকে ‘একপক্ষীয় এবং অসম’ উল্লেখ করে তা বাতিলের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, চুক্তির মূল ভিত্তিই এখন প্রশ্নবিদ্ধ। যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছিল, তা পরবর্তী সময়ে মার্কিন আদালত বাতিল করে দেয়। নির্বাচনের তিনদিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়, আর ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন আদালত অতিরিক্ত শুল্ক বাতিল করে দেয়। অল্প কয়েকদিন অপেক্ষা করলে এই চুক্তির প্রয়োজনই পড়ত না।
চুক্তির শর্তের অসামঞ্জস্য নিয়ে তিনি বলেন, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির স্বাধীনতা সংকুচিত হবে। চীনসহ যেকোনো দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যচুক্তি করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন পণ্যে শূন্য শুল্কের সুবিধা দেখে অন্যান্য দেশও একই দাবি তুললে বাংলাদেশ বিপাকে পড়তে পারে।
চর্চা’র সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, অসম এই বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে একতরফা সুবিধা ও কর্তৃত্ব নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে শুল্ক ও শুল্ক-বহির্ভূত নানা অসম শর্ত। এগুলোকে আমলে নিয়ে বর্তমান সরকারকে এই চুক্তি বাতিলের পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তার কোনো বিষয়ই প্রাধান্য পায়নি। মনে হচ্ছে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে চলে যাচ্ছে দেশ। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, তাদের রুখতে হলে বাকি সব দেশকে একত্রিত হতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের সমম্বয়ক এবং বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট বা গোপনীয়তার নীতি মেনে হওয়া এই চুক্তি অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বর্তমান নির্বাচিত সরকার কেউই প্রকাশ করেনি। তবে মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে ২৮ পৃষ্ঠার একটি নথি। বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই এই অসম বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে হবে।
বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন বিসিকের সাবেক পরিচালক আবু তাহের খান, বিজিএমইএ’র সহসভাপতি ইনামুল হক খান প্রমুখ।
- বিষয় :
- বাণিজ্যচুক্তি
- যুক্তরাষ্ট্র
- আনু মুহাম্মদ
