ফিরে দেখা জুলাই
এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু বেশির ভাগই শ্রমজীবী
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের প্রতিহত করতে অস্ত্র হাতে ট্রাকের ওপর বসা যুবলীগ কর্মী। বরিশালের সিঅ্যান্ডবি এলাকায় ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৮ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১২:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোর ১৯ জুলাই ছিল একটি বিভীষিকাময় দিন। সেদিন শুক্রবার রাজধানী ঢাকা যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এদিন সারাদেশে ১৪৮ জনকে হত্যা করা হয়। নিহতদের বড় অংশই ছিলেন শ্রমজীবী। যারা আগের দিন আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের রক্ষায় জীবন তুচ্ছ করে রাজপথে নেমেছিলেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে দেশজুড়ে নজিরবিহীন সংঘর্ষ, ব্যাপক প্রাণহানি এবং মধ্যরাত থেকে দেশব্যাপী কারফিউ জারি ও সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এই দিনটি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ও মোড় পরিবর্তনকারী দিন হিসেবে চিহ্নিত।
এদিন প্রতি মুহূর্তে গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারীদের আনা হচ্ছিল হাসপাতালগুলোতে। মরদেহের স্তূপ পড়ে ছিল মর্গে। ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (আইটিজেপি) এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের (টিজিআই) ‘ব্লাডশেড ইন বাংলাদেশ’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চব্বিশের ১৯ জুলাই এক দিনেই শহীদ হন ১৪৮ জন। তাদের ৫৪ জনকে মাথায় বা গলায় গুলি করা হয়েছিল। ধারণক্ষমতার চেয়ে আহত মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রায় সব হাসপাতালে গজ এবং ব্যান্ডেজের সংকট দেখা দেয়।
ঢাকার উত্তরা-আজমপুর, রামপুরা-বাড্ডা, মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডি, মিরপুর, এবং যাত্রাবাড়ী-শনির আখড়া যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীদের পাশে সেদিন জনতা রাজপথে লড়াই করে পুলিশের স্বয়ংক্রিয় এপিসি, রায়ট কার এবং আকাশ থেকে হেলিকপ্টারে ছোড়া সাইন্ড গ্রেনেডের বিরুদ্ধে। অসম যুদ্ধে জনতা হার মানেনি। স্বাধনীতার পর সেদিনই বড় ধরনের প্রাণহানির সাক্ষী হয় দেশের মানুষ।
তবে তৎকালীন সরকারের এতে ভ্রুক্ষেপ ছিল না। ছাত্র-জনতাকে দমনে আরও কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সারাদেশে সেনা মোতায়ন এবং ১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত হয়। গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠক করেন। তাঁর মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, কারফিউ মানে দেখামাত্র গুলি।
আগের রাত থেকেই বন্ধ ছিল ইন্টারনেট। ফলে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের খবর পৌঁছায়নি সারাদেশে। কিন্তু মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে যায়। ১৯ জুলাই সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় সকাল থেকেই রাজপথ ফাঁকা ছিল। রাজপথে ছিল আগের দিনের রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার ক্ষত। সেদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা পেরিয়ে জুমার নামাজে জমায়েত হওয়ার সুযোগ পায় সাধারণ মানুষ।
নামাজের পর মসজিদ থেকে একযোগে বের হয় ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ। উত্তরার প্রায় সবকয়টি সেক্টরের মসজিদ থেকে মিছিল বের হয় হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে। পুলিশ এতেও গুলি চালায়। আন্দোলনকারীরা আজমপুরে হাউজ বিল্ডিংয়ের সামনে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক বন্ধ করে দেন। তাদের ওপরও গুলি ছোড়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করায় পুরো এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছেন।
রামপুরা ব্রিজ এবং বনশ্রী এলাকায় সেই দুপুরে শিক্ষার্থীদের মিছিলের ওপর পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একযোগে হামলা চালান। মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেল এবং বুলেট ছোড়া হয়। রামপুরায় নিজ বাসার গ্যারেজে দাঁড়িয়ে থাকা সাত বছরের শিশু মুসা খান গুলিতে প্রাণ হারায়।
হানিফ ফ্লাইওভার এবং যাত্রাবাড়ী মোড়ে দিনভর মুহুর্মুহু সংঘর্ষ চলে। আন্দোলনকারীদের দমাতে পুলিশ প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে। বছিলা এলাকায় হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়া হয়।
বিকেলের পর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের মতো প্রধান হাসপাতালগুলোতে শত শত রক্তাক্ত মানুষকে নিয়ে আসা হয়। গুরুতর আহত এবং গুলিবিদ্ধ মানুষের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে অনেক হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী ও ব্যান্ডেজের সংকট দেখা দেয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশেরই মাথা, বুক ও গলায় বুলেটের ক্ষত ছিল।
ঢাকার বাইরেও আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। নরসিংদীতে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা চালিয়ে শত শত কয়েদি মুক্ত করে দেয়। কারাগারের স্থাপনায় আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া রংপুর, সাভার, গাজীপুর, সিলেট, বগুড়া এবং ময়মনসিংহে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হন।
সেদিন মধ্যরাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে সাদা পোশাকে ডিবি পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে তাঁকে নির্যাতন করা হয়।
সমকালের খবর অনুযায়ী, চব্বিশের ১৯ জুলাই রংপুরে পাঁচজন, গাজীপুর, বগুড়া, ময়মনসিংহ, সিলেট ও মাদারীপুরে একজন করে শহীদ হন। এদিন রাজধানীতে বিআরটিএ ভবন ও পিবিআই কার্যালয়সহ বেশ কয়েকটি সরকারি স্থাপনায় আগুন দেয় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো ভবনে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। মেট্রোরেলের কাজীপাড়া স্টেশনে ভাঙচুর চালানো হয়।
এদিনও সরকারের সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৯ দফা দাবি পেশ করে। আন্দোলনের সমন্বয়করা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।
- বিষয় :
- জুলাই গণঅভ্যুত্থান