এক দিনে পাওয়া যাবে মার্কিন তুলা, ওয়্যারহাউস চট্টগ্রামে
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে তিন থেকে পাঁচ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। এই সময় মাত্র এক দিনে নেমে আসবে। মার্কিন তুলা সংরক্ষণ ও সরবরাহে বেসরকারি খাতে একটি ওয়্যারহাউস হচ্ছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। আগামী অক্টোবরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ওয়্যারহাউস চালু হবে।
মার্কিন তুলার তিনটি চালান সুতা-বস্ত্র উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে ভাড়া করা স্থাপনায় ১০০ টন তুলা মজুত করা হবে। সরবরাহ উপযোগী স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল বা ফ্রি ট্রেড জোনের (এফটিজেড) নির্মাণকাজ শেষ হলে সেখানে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। ‘আমেরিবাংলা করপোরেশন’ নামে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের এই উদ্যোগে সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, সেই দেশের কৃষি বিভাগ ও ইউএস এক্সিম ব্যাংক।
জানা গেছে, আমেরিবাংলা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকের কাছ থেকে তুলা এনে ব্যবহার উপযোগী করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে তুলা কিনে বাংলাদেশে সরবরাহ করবে। এতে প্রক্রিয়াগত ব্যয় কম হবে। বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হয়, তাতে চট্টগ্রাম বন্দরে তুলা পৌঁছাতে প্রতি পাউন্ডে খরচ পড়ে প্রায় ৮৫ সেন্ট। বেসরকারি ওয়্যারহাউসের মাধ্যমে বাজারমূল্যের চেয়ে প্রতি পাউন্ডে অন্তত ১০ সেন্ট কম দামে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে গত ২৭ আগস্ট কাঁচা তুলার ডিজিটাল নিলামের জন্য ‘কটনপোর্ট’ প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। ৮ অক্টোবর ম্যানহাটানে চালু হবে ‘অল আমেরিকান কটন সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম’, যা সার্টিফাইড কাপড়ের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কছাড় দেবে। এ ছাড়া কাঁচা তুলার ওপর ১৮ শতাংশ ট্যাক্স ক্রেডিট বা করছাড় সুবিধা পাওয়া যাবে। অক্টোবরে নিউইয়র্কে চালু হবে আমেরিবাংলা কটন ল্যাব, যার মাধ্যমে নিউইয়র্কের ১০ জন ফ্যাশন ডিজাইনার সার্টিফাইড মার্কিন তুলা ব্যবহার করে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের পক্ষে পোশাক ডিজাইন করতে পারবেন।
বেসরকারি খাতে ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা বাংলাদেশি-আমেরিকান আসওয়ার রহমান সমকালকে বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রতিযোগিতার বাজারে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানো তাদের লক্ষ্য। বর্তমানে ১০ বিলিয়ন ডলারের কম রপ্তানিকে ২০৪৫ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে তাদের উদ্যোগের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ যাতে দ্রুত মার্কিন রপ্তানি বাজারে আরও ভালো অবস্থান নিতে পারে, সে বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন তারা। এ লক্ষ্যেই ‘আমেরিবাংলা করপোরেশন’ একটি কৌশলগত রোডম্যাপ উন্মোচন করেছে। এর ফলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না থাকলে এক দিনের ব্যবধানেই কারখানায় মার্কিন তুলা পেতে পারবেন উদ্যোক্তারা। বর্তমানে মার্কিন তুলা চট্টগ্রাম বন্দরে আসতে তিন থেকে পাঁচ মাস লেগে যায় বলে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড–এআরটি’ সইয়ের পর বাণিজ্য বাড়ানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন তুলা ব্যবহার করে উৎপাদিত তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কছাড় সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ফলে তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধায় রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
ভাড়া করা স্থাপনায় ওয়্যারহাউসে মার্কিন তুলা আমদানি ও সরবরাহ কার্যক্রম কতটা টেকসই হবে– এ প্রশ্নে আমেরিবাংলার প্রধান নির্বাহী আসওয়ার রহমান বলেন, ভাড়া স্থাপনায় বেশি দিন এই কার্যক্রম চালানো হবে না। সরকার মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল নির্মাণ করে দিলে সেখানেই তারা স্থায়ী কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের কাজ যাতে দ্রুত শুরু করা হয়, সে জন্য সরকারের প্রতি এক ধরনের নৈতিক চাপ তৈরি করবে তাদের এই উদ্যোগ।
জানা গেছে, সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল বা ফ্রি ট্রেড জোনের (এফটিজেড) নির্মাণ কার্যক্রম অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটি (সিসিইএ)। জমি উন্নয়ন প্রক্রিয়ার পর্যায়ে রয়েছে। আনোয়ারায় ৮০০ একর জমির ওপর এই জোন নির্মাণ করা হচ্ছে। এই কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে গড়া হবে এই জোন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশ ৩৫ কোটি ডলার মূল্যের মার্কিন তুলা আমদানি করেছে। আগের বছরের চেয়ে আমদানি বেড়েছে ১০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সুতা আমদানি দুই বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিটিএমএ। বিটিএমএর পরিচালক ও লিটল গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম সমকালকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা অন্য বাজারের চেয়ে কিছুটা ব্যয়বহুল। তবে মানে উন্নত হওয়ায় অপচয় কম হয়। স্থানীয়ভাবে তুলা পাওয়া গেলে সুতা ও বস্ত্র উৎপাদনে বড় ধরনের সুফল পাওয়া যাবে। লিড টাইম, অর্থাৎ ক্রেতার শোরুমে পণ্য পৌঁছানোর সময় অনেক কমে আসবে।
তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সমকালকে বলেন, মার্কিন তুলা ব্যবহারে বাড়তি কী সুবিধা পাওয়া যাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে এ ব্যাপারে একটি স্পষ্টীকরণ বক্তব্য চেয়েছেন তারা। চূড়ান্ত বাস্তবায়ন নির্দেশিকা পাওয়ার জন্য তারা অপেক্ষা করছেন। এ বিষয়ে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে বিজিএমইএ যোগাযোগ রাখছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিষয়টি স্পষ্ট করা হবে।
দেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র। পোশাকের মোট রপ্তানি আয়ের ২০ শতাংশের মতো আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। গত অর্থবছর সে দেশে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। আগের অর্থবছরের চেয়ে রপ্তানি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি হয়েছে। পোশাকবহির্ভূত পণ্য মিলে রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৯০০ কোটি ডলার।
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্র