ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আত্মহত্যা বেড়েছে, প্রতিরোধে নেই জাতীয় কর্মকৌশল

আত্মহত্যা বেড়েছে, প্রতিরোধে নেই জাতীয় কর্মকৌশল
×

 তবিবুর রহমান 

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৩ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর হার গত ছয় বছরে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। ২০১৭ সালে প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর হার ছিল চারজন। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ জনে। অথচ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে এই হার প্রতি লাখে ৩ দশমিক ৫ জনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সে লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বরং আত্মহত্যার হার বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হেলথ বুলেটিন ২০২৪-এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও দেশে আত্মহত্যা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল প্রণীত হয়নি। সম্প্রতি ২০২৬-৩০ মেয়াদের জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে এবং এর একটি খসড়াও তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আজ বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য– ‘আত্মহত্যা নিয়ে প্রচলিত ধারণা পরিবর্তন’ এবং আহ্বান ‘কথা শুরু করুন’।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যান। এর ৭৩ শতাংশই ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণের মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ আত্মহত্যা। ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যায় ৪ হাজার ৭১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩ জন আত্মহত্যায় মারা গেছে। 

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমিত সংখ্যার তুলনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নথিভুক্ত আত্মহত্যার সংখ্যা অনেক বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আর্থিক সহায়তায় জাতীয় জরিপ (২০২২-২৩) করেছে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)। তারা বলছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ২০ হাজার ৫০৫ জন আত্মহত্যা করেন। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আত্মহত্যা করেছেন ১৩ হাজার ৯২০ জন।

দেশে আত্মহত্যা প্রতিরোধে কোনো কর্মকৌশল প্রস্তুত না হলেও আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় এ পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের ডেপুটি প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ও আইসিডিডিআর,বির মা ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের গবেষক মোহাম্মদ সোহেল শমীক বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ২০২২ সালে মানসিক স্বাস্থ্যনীতি হলেও আত্মহত্যা প্রতিরোধে কোনো জাতীয় কর্মকৌশল করা যায়নি। প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম না থাকায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি। আমরা একটি পরিকল্পনা তৈরির কাজ করছি। ইতোমধ্যে একটি খসড়া প্রস্তুত হয়েছে। 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (এনআইএমএইচ) সর্বশেষ জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, আত্মহত্যার চিন্তা ও চেষ্টার ক্ষেত্রে শহরের তরুণরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। শহরাঞ্চলের ৮ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা আত্মহত্যার চিন্তার কথা জানিয়েছেন। গ্রামাঞ্চলে এ হার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। গবেষণায় বাল্যবিবাহ, বেকারত্ব ও পারিবারিক সহিংসতার মতো সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক সমস্যার অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তিদের আত্মহত্যার ঝুঁকি বেশি পাওয়া গেছে। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কারণে উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক পর্যায়ের ব্যক্তিদের মধ্যেও ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে।

গবেষণায় আত্মহত্যার সবচেয়ে ঘন ঘন উল্লিখিত কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পারিবারিক দ্বন্দ্ব। ব্যক্তিগত ও সম্পর্কজনিত সমস্যা, যার মধ্যে দাম্পত্য কলহ অন্যতম। এ ছাড়া পরীক্ষা বা শিক্ষাজীবনে ব্যর্থতা, পরীক্ষার চাপ, আকস্মিক রাগ বা আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়া, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, পরিবারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তার অভাব, বিষণ্নতা, বেকারত্ব ও মাদকাসক্তির মতো বিষয় আত্মহত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, আত্মহত্যায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন উপকরণ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে। আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের দূরে সরিয়ে না দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং কোনোভাবেই তাদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তাদের পাশে বসে– কেন এমন চিন্তা বা অনুভূতি হচ্ছে, তা জানতে হবে এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা দিতে হবে।

তিনি বলেন, তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো কিছু করার আগ্রহ ও প্রেরণা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই সংকটের সময় তাদের একা না রেখে পাশে থাকা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে আত্মহত্যা প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। 

চার কৌশলে গুরুত্ব ডব্লিউএইচওর
আত্মহত্যা প্রতিরোধে ডব্লিউএইচওর ‘লাইভ লাইফ’ পদ্ধতিতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো– আত্মহত্যার উপায় সহজে পাওয়ার সুযোগ কমানো, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা, কিশোর-কিশোরীদের জীবন দক্ষতা বাড়ানো এবং আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা ও নিয়মিত ফলোআপ করা।

ডব্লিউএইচও বলছে, আত্মহত্যা প্রতিরোধ শুধু স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্ব নয়। শিক্ষা, কৃষি, বিচার, পরিবহন, সমাজকল্যাণসহ বিভিন্ন খাতকে যুক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। কীটনাশকের ব্যবহার ও সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ, আগ্নেয়াস্ত্রের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং আত্মহত্যাপ্রবণ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। 

বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশীদ মোহামেদ বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিভিন্ন খাত ও সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ঝুঁকি কমানো, সহায়তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং মানসিক সংকটে থাকা মানুষকে দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

আঁচল ফাউন্ডেশনের লিড সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. সাইয়েদুল ইসলাম বলেন, আত্মহত্যা শুধু একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়। এর আগে আত্মহত্যার চিন্তা, বিষণ্নতা, একাকিত্ব, বুলিং, পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ থাকতে পারে। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধের কাজ মৃত্যুর ঠিক আগে নয়; অনেক আগে থেকেই শুরু করতে হবে। 

তিনি বলেন, এখন শুধু সচেতনতা কর্মসূচি নয়; প্রয়োজন তথ্য, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রশিক্ষিত জনবল, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, অর্থায়ন ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে একজন তরুণ বলতে পারেন– আমি ভালো নেই এবং তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ ও সেবা পাওয়া যায়।

 

আরও পড়ুন

×