বিহঙ্গ
তরুণ কাঠমৌরের উভয় সংকট
ময়ূর না হলেও ময়ূরের অতি-নিকটাত্মীয় কাঠমৌর পাখি- লেখক
ইনাম আল হক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩৯ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
যারা পাখির ছবি তোলে তারা বলেছে, ‘সারাদিন বনে নিশ্চল দাঁড়িয়ে না থাকলে কাঠমৌর পাখির দেখা পাবেন না।’ আমি এসেছি চট্টগ্রামের হাজারিখিল অভয়ারণ্যে। এখানে অনেকেই এ পাখির ছবি তুলেছে। ক্ষয়িষ্ণু এ বনভূমিই সম্ভবত এখন বাংলাদেশের অতি বিরল এই পাখির শেষ আশ্রয়স্থল। এককালে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সব পাহাড়ি বনেই এদের বসতি ছিল। হাজারিখিলে দুদিন নীরবে বনতলে হেঁটে কাঠমৌরের ডাক শুনলেও দেখা পাইনি। হতাশ হয়ে নবীন ফটোগ্রাফারদের ফোন করেছি। তারা পরামর্শ দিয়েছে, ‘হাঁটলে হবে না; ডাক শুনলেই নিশ্চল দাঁড়াতে হবে। গা-ঢাকা দিয়ে অপেক্ষা করতে হবে কয়েক ঘণ্টা।’
জানি, লোকচক্ষু এড়িয়ে চলার বহু জারিজুরি জানে কাঠমৌর। কিন্তু বনের লাজুক পাখিদের তালাশ করার তালিমও আমরা কম নিইনি। তাই বিশ্বাস হচ্ছে না যে, পোষা-মুরগির চেয়েও আকারে বড় এই কাঠমৌর পাখির পুরুষগুলো চড়া গলায় ‘ওক-কো-কো-কো-কো-কো’ ডেকে মাটিতে হেঁটে বেড়ালেও দুদিন ধরে আমি তার একটিও দেখতে পাইনি! নবীনের পরামর্শমতো মশা ও জোঁকের প্রতিরোধক গায়ে মেখে পাতার আড়ালে স্থির বসে রইলাম তৃতীয় দিন। বসে আছি তো বসেই আছি; খঞ্জন ও চেরালেজ পাখির আনাগোনা দেখে দিনের প্রথমার্ধ গেলেও নিস্তরঙ্গ দুপুর আর কাটে না। নিদ্রা-প্রতিরোধকের প্রয়োজনটাই প্রকট হয়ে উঠল দ্বিপ্রহরে। ঝিমুনি ঝেড়ে ফেলার জন্য উঠে দাঁড়াতেই কাঠমৌরের পরিচিত ডাকটি কানে এলো। নিশ্চল দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষায় রইলাম আঙুলের ওপর আঙুল তুলে।
প্রতীক্ষার পুরস্কারটি এলো ঘণ্টাখানেক পর। দেখতে পেলাম, কালচে-খয়েরি পালকের গম্ভীর এক পাখি সতর্ক পা ফেলে পাহাড়ের ঢালে হাঁটছে। পাখির পিঠ, ডানা ও লেজের দীর্ঘ পালকের শেষ প্রান্তে সারি সারি সবুজ, নীল ও বেগুনি চক্র। ঝিরির পাড়ে গজানো ঢেঁকিশাকের ঝোপে ঢুকে পাখিটি ডাকল ‘ওক-কো-কো…’। ঝোপের বাইরে এসে সে আর ডাকল না। তাই বলতে পারি না বনমোরগের মতো গলা ফুলিয়েই সে ডাকে কিনা! মনে পড়ল কাঠমৌর পাখিদের জীবনে অনিবার্য এক উভয় সংকটের কথা। প্রজনন-মৌসুমে প্রতিযোগীকে দূরে রাখার জন্য ছেলেদের সারাদিন ডাকাডাকি করতে হয়। এর ফলে মানুষ, খাটাশ, বনবিড়াল, বাজ, শিকরে, নাগঈগল ইত্যাদি শত্রুর নজরে পড়ার আশঙ্কাটা বাড়ে। পালকের আড়ম্বরে আড়াই ফুট দীর্ঘ হলেও ছেলে কাঠমৌরের ওজন এক কেজিরও কম। তাই শিকরের মতো ছোট শিকারি পাখিও ওদের টুঁটি চেপে ধরতে পারে। মৃত্যুঝুঁকি না নিয়ে কোনো তরুণ কাঠমৌরই তার জিনকে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছাতে পারে না।
কাঠমৌর পাখিরা ময়ূর না হলেও ময়ূরের অতি-নিকটত্মীয়। ময়ূর হারিয়ে গেলেও আমাদের বনে কাঠমৌর আজও টিকে আছে। বিশ্বের মোট আট প্রজাতির কাঠমৌরের মধ্যে আমাদের আছে এই একটি। এর ইংরেজি নাম ‘গ্রে পিকক-ফেজ্যান্ট’ আর পোশাকি বাংলা নাম ‘মেটে কাঠমৌর’। মেটে কাঠমৌর পাখির আবাসগুলো বাংলাদেশ থেকে পুবদিকে ভিয়েতনাম পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের দেশে আজ এ পাখি অত্যন্ত বিরল ও মহাবিপন্ন ঘোষিত হয়েছে। ভাগ্যিস কাঠমৌরের এই করুণ দশা অন্য দেশগুলোতে হয়নি!
হাজারিখিল বনে সম্ভবত শিকরে, শিকরেঈগল ও নাগঈগলের নখরে প্রতি মৌসুমেই উদ্দীপ্ত, উচ্ছ্বসিত ও অধীর দুয়েকটি তরুণ কাঠমৌর প্রাণ হারায়। প্রকৃতির নিগড়ে ঘটছে বলে সেই অকালমৃত্যু নিয়ে আমরা তেমন উদ্বিগ্ন নই। তবে এ দেশে পাখিটির অস্তিত্বই বিপন্ন বলে কিছু তথ্য আমাদের জানা দরকার। বিশেষ করে মানুষের আনাগোনা এই নিভৃতচারী পাখির জীবনযাত্রায় কী প্রভাব ফেলছে সেটা জানতেই হবে।
- বিষয় :
- বিহঙ্গ