বিশ্লেষণ
চীন-জাপান প্রতিযোগিতায় কূটনৈতিক ভারসাম্য জরুরি
হুমায়ুন কবির
হুমায়ুন কবির
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৫ | আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে বাংলাদেশের জন্য বড় অঙ্কের বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেইর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে টোকিওর।
তবে এ অর্থ সম্ভাব্য বিনিয়োগের হিসাব; নিশ্চিত অর্থছাড় নয়। এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, অবকাঠামোর সুফল নিশ্চিত করা এবং চীন ও জাপানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়ে বাংলাদেশকে সুস্পষ্ট কৌশল নিতে হবে।
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার ক্ষেত্র অবকাঠামোর গণ্ডি ছাড়িয়ে বাণিজ্য, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্প ও মানবসম্পদ উন্নয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত। এ সহযোগিতাকে উৎপাদন বাড়ানো, দক্ষ কর্মী তৈরি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। শুধু বিনিয়োগের ঘোষণা নয়, দেশের অর্থনীতিতে এর সুফল কতটা মিলছে, সেটিই হবে সাফল্যের মাপকাঠি।
বিনিয়োগের পরিবেশে পরিবর্তন জরুরি
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু সুযোগ-সুবিধার ঘোষণা দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন না। তারা দেখেন, কোথায় সহজে ব্যবসা করা যায়, নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন হয় কিনা এবং অনুমোদন পেতে কত সময় লাগে। তাই বাংলাদেশকে ব্যবসার অনুমোদন সহজ করতে হবে, প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
ভারতসহ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের বাড়তি সুবিধা কী, তা স্পষ্ট করতে হবে। জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাব্য অর্থ যেন কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য প্রকল্প চিহ্নিত করা, বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার দায়িত্ব বাংলাদেশের নিজের; বিদেশি অংশীদারত্ব সেই কাজের বিকল্প হতে পারে না।
মাতারবাড়ী ঘিরে আঞ্চলিক অর্থনীতির সুযোগ
জাপানের ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ উদ্যোগের আওতায় বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগ, জ্বালানি, বন্দর ও শিল্প অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো কার্যকর হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং শিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।
তবে বন্দর নির্মাণ করলেই প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে, বিষয়টি এমন নয়। মাতারবাড়ীকে দেশের শিল্পাঞ্চল ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, উন্নত সড়ক ও রেল যোগাযোগ, দক্ষ জনবল এবং দ্রুত পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অবকাঠামোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
এসব শর্ত পূরণ হলে বাংলাদেশ শুধু পণ্য পরিবহনের পথ হিসেবে নয়, আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হিসেবেও নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারবে। এ জন্য প্রকল্পগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
চীন-জাপান প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান
চীন ও জাপান– দুই দেশেরই বাংলাদেশের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্প ও আঞ্চলিক যোগাযোগে তাদের আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করে। একই সঙ্গে এ অঞ্চলে দুই দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে জটিল করে তুলতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে কোনো এক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে অন্য পক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা নির্ধারণ করা উচিত নয়। প্রতিটি প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভ, প্রযুক্তিগত সুবিধা, অর্থায়নের শর্ত, দীর্ঘমেয়াদি দায় এবং জাতীয় নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোন খাতে কার সঙ্গে সহযোগিতা দেশের জন্য বেশি কার্যকর, তা নির্ধারণের ভিত্তি হবে বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার।
কূটনৈতিক যোগাযোগেও স্বচ্ছতা জরুরি। জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা চীনের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নয়– এ বিষয়টি পরিষ্কার রাখতে হবে। একইভাবে চীনের সঙ্গে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্কও জাপানের সঙ্গে নতুন অংশীদারিত্বের বাধা হওয়া উচিত নয়। দুই দেশের স্বার্থ ও উদ্বেগের পার্থক্য বুঝে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় পক্ষ নেওয়ার চাপ এড়িয়ে উভয়ের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়ানোই হবে বিচক্ষণ কূটনীতির কাজ।
এ জন্য বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। প্রকল্প নির্বাচন ও অর্থায়নের শর্তে স্বচ্ছতা, ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেলে বিদেশি সহযোগিতার সুফল দেশের অর্থনীতিতে থাকবে। এতে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানোর সুযোগও তৈরি হবে।
অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ও আঞ্চলিক সহযোগিতা
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) গত ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তির সুফল পেতে এর কার্যকর বাস্তবায়নের প্রস্তুতি এবং বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। জাপানের বাজারে প্রবেশের সুযোগ কাজে লাগাতে পণ্যের মান, উৎপাদন দক্ষতা ও রপ্তানির বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাণিজ্যে সম্ভাব্য পরিবর্তন মোকাবিলার প্রস্তুতিও নিতে হবে।
ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী প্রকল্পের মতো উদ্যোগের সুফল পেতে নির্মাণকাজের পাশাপাশি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। জাপানের প্রযুক্তিগত সহযোগিতাকে স্থানীয় জনবল তৈরি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের লাভ বাড়বে।
রোহিঙ্গা সংকটেও জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের নিজস্ব প্রয়োজন এবং আঞ্চলিক বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হবে।
জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া পরস্পরবিরোধী নয়। বাংলাদেশের মূল কাজ হলো বিদেশি বিনিয়োগকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়া এবং বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যেও জাতীয় স্বার্থে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়া। সম্পর্কের ভারসাম্য কেবল কূটনৈতিক বক্তব্যে নয়, প্রকল্প নির্বাচন, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তেও প্রতিফলিত হতে হবে।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত
- বিষয় :
- হুমায়ুন কবির
- চীন
- জাপান
- প্রতিযোগিতা