ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ল্যানসেটের প্রতিবেদনে করোনায় প্রায় সাড়ে চার লাখ মৃত্যু

নাকচ করল স্বাস্থ্য বিভাগ, দ্বিমত বিশেষজ্ঞদেরও

নাকচ করল স্বাস্থ্য বিভাগ, দ্বিমত বিশেষজ্ঞদেরও
×

রাজবংশী রায়

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১২ মার্চ ২০২২ | ১৫:০০

দেশে করোনাভাইরাসের মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানসেটের গবেষণা প্রতিবেদন নাকচ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনেকের অভিমতও প্রায় অভিন্ন। তবে কেউ কেউ ল্যানসেটের গবেষণা প্রতিবেদন সরাসারি নাকচ করেননি। অন্যরা আবার বলেছেন, ল্যানসেটের তথ্য চ্যালেঞ্জ করার মতো তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছে নেই। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, যেসব প্রক্রিয়া অবলম্বন করে এ ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করা হয়েছে, বাংলাদেশে কভিডে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। তবে সরকারিভাবে মৃত্যুর যে সংখ্যা দেখানো হয়েছে, কভিডে তার তুলনায় অনেক বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সরকারের প্রতি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে এ ধরনের ক্ষেত্রে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করলে তা ভবিষ্যতে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নে কার্যকর ফল দেবে।

বৃহস্পতিবার ল্যানসেটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি হিসাবের বাইরে বাংলাদেশে চার লাখ ১৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রায় ১৫ গুণ বেশি। ২০২০ সালের শুরু থেকে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি হিসাবে করোনায় মারা গেছেন ২৮ হাজার ১০০ জন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতি লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে কভিডে ৯ দশমিক দু'জন মারা গেছেন বলে বলা হলেও এ সময় অতিরিক্ত ১৩৪ দশমিক সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মানে হচ্ছে, প্রতি লাখ জনসংখ্যায় বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যু হয়েছে ১৪৪ জনের। তাদের প্রতিবেদন সত্য হলে করোনা মহামারিতে দেশে এখন পর্যন্ত চার লাখ ৪২ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন।

তবে এ গবেষণা প্রতিবেদন নাকচ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সমকালকে বলেন, ল্যানসেটের প্রতিবেদন ভিত্তিহীন ও মনগড়া। তাদের প্রতিবেদন সঠিক হলে বাংলাদেশের রাস্তায় রাস্তায় মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যেত। পুরো মহামারিকালে কভিড ও অন্যান্য সব রোগ মিলেও সাড়ে চার লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। কোন প্রক্রিয়ায় এ ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করা হলো, তা ল্যানসেটের কাছে জানতে চাওয়া হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ-সংক্রান্ত চিঠি তৈরি করছে। দ্রুতই ওই চিঠি পাঠানো হবে।

ল্যানসেটের গবেষণায় দেখা যায়, করোনায় সাতটি দেশে বিশ্বের মোট মৃত্যুর অর্ধেক ঘটেছে। এগুলো হলো- ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, মেক্সিকো, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান। ভারতে সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে ৪১ লাখ বেশি মানুষ মারা গেছেন। করোনায় বিশ্বে যত মানুষ মারা গেছেন, তার ২২ শতাংশই ঘটেছে ভারতে। তবে সরকারি হিসাবে দেশটিতে মৃত্যু ৫ লাখ ১৬ হাজারের কাছাকাছি।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ১৯১টি দেশ ও অঞ্চলের তথ্য বিশ্নেষণ করে করোনার সংক্রমণে মৃত্যু বেশি হওয়ার এ তথ্য দিয়েছেন। মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তারা আগের ১১ বছরের পরিসংখ্যানের আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের হিসাবে, করোনায় বিশ্বে সরকারি হিসাবে যত মৃত্যুর কথা বলা হয়, প্রকৃত সংখ্যা এর তিন গুণ।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন সমকালকে বলেন, ল্যানসেটের প্রতিবেদন সঠিক নয় বলে মনে করি। এ হিসাব করতে হলে ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালে মৃত্যুর তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করতে হবে। ২০১৯ সালের মৃতের সঙ্গে পরবর্তী দুই বছরের তুলনা করলে প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে। দেশে এখন জন্ম-মৃত্যুর নিবন্ধন হয়। সুতরাং এটি বের করা সহজ। আর মৃত ব্যক্তিদের করবে মাটি দেওয়া অথবা শ্মশানে দাহ করা হয়েছে। সেই কবরগুলো তো হাওয়া হয়ে যায়নি।

তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের নেতৃত্বে গণমাধ্যমে প্রকাশিত করোনার উপসর্গ মৃত্যুর পরিসংখ্যা নিয়ে একটি প্রতিবেদন করা হয়েছে। তাতে সরকারি হিসাবের বাইরে বাড়তি কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ল্যানসেটের প্রতিবেদনে ১৫ গুণ বেশি মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। এটি অবিশ্বাস্য বলেই মনে হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালক বলেন, ল্যানসেটের গবেষণা প্রতিবেদন আমি এখনও দেখিনি। সুতরাং না দেখে মন্তব্য করা সঠিক হবে না। তারা কোন প্রক্রিয়ায় এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে, তাতে কী কী ইন্ডিকেটর ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো জানতে হবে। এসব বিষয় জানার পরই এ বিষয়ে কথা বলা যাবে।

বিএমএর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, ল্যানসেটের ওই গবেষণা প্রতিবেদনের সঙ্গে সহমত পোষণ করার কোনো কারণ নেই। কারণ শনাক্ত রোগীদের মধ্যে যাদের মৃত্যু হয়েছে, সেগুলো সরকারি হিসাবে এসেছে। এ ছাড়া শনাক্ত না হওয়া রোগীদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, সেগুলো গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সেই সংখ্যা আমলে নিলে সরকারি হিসাবের তুলনায় দ্বিগুণ মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু ১৫ গুণ বেশি মানুষ কভিডে মৃত্যুবরণ করেছেন, সেটি সঠিক হবে মনে হয় না। এত সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হলে তা সবার নজরে আসত।

ল্যানসেটের কী তাহলে ভুল বা মিথ্যা তথ্য দিয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে রশিদ-ই মাহবুব বলেন, 'ল্যানসেট যে ভুল তথ্য দেয় না, সেটি কে বলেছে? আমাদের দেশের চিকিৎসক সমাজ, গবেষক ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা ল্যানসেটকে গুরুত্ব দেয়। তাই বলে তারা যা লিখে দেবে সেটিই সঠিক ভাবার কোনো কারণ নেই। অন্যান্য দেশের বিষয়ে তারা কী বলল সে বিষয়ে মন্তব্য করব না। কিন্তু বাংলাদেশে কভিডে মৃত্যু নিয়ে যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটি সত্য বলে মনে করি না।'

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক সমকালকে বলেন, যেসব প্রক্রিয়া মেনে তথ্য-উপাত্ত অর্থাৎ করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিরূপণ করা হয়, বাংলাদেশে তা অনুসরণ করা হয়নি। এ কারণে ল্যানসেটের প্রতিবেদনে মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়েছে, তা চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা সরকারের, বিশেষ করে স্বাস্থ্য বিভাগের নেই। তবে সরকারি হিসাবে করোনায় মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে, তার তুলনায় অনেক বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন।

তিনি আরও বলেন, সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে, ভবিষ্যতে করোনার মতো কোনো মহামারি কিংবা রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়লে যেন যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে আনা হয়। তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে তা গ্রহণযোগ্য হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা প্রণয়ন করাও সহজ হবে।

আরও পড়ুন

×