ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আমলাদের 'দৌরাত্ম্য'

রাজনৈতিক সমাধান চায় সব পক্ষ

রাজনৈতিক সমাধান চায় সব পক্ষ
×

দেলওয়ার হোসেন

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৩ জুন ২০২২ | ১৪:৪৫

প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন পেশাজীবীকে নিষ্পেষিত করছে আমলাতন্ত্র। প্রশাসনের নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না বিদ্যমান বিধিমালা। গুটিকয়েক কর্মকর্তার হাতে বন্দি হয়ে পড়েছে পুরো প্রশাসন। জুনিয়র কর্মকর্তাদের অধীনে কাজ করতে হচ্ছে সিনিয়র কর্মকর্তাদের। এতে ভেঙে পড়ছে প্রশাসনের 'চেইন অব কমান্ড'। এসব সমস্যা সমাধানে প্রকৃচির (প্রকৌশলী-কৃষিবিদ-চিকিৎসক) কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা বহুবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আবেদনও করেছেন। পেশাজীবীরা আমলাদের এ দৌরাত্ম্য ঠেকাতে পথ খুঁজছেন। এসব সমস্যা সমাধানে কিছু দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা। অবশ্য এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমলা, পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞ সব পক্ষই চায় রাজনৈতিক সমাধান।

জানা যায়, আমলাতন্ত্রের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে প্রকৃচির একাধিক সংবাদ সম্মেলনেও আহ্বান জানানো হয়। সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবদের কাছেও লিখিত আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা সমাধান হয়নি বরং বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার পেশাজীবীদের এক মতবিনিময় সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে ফের তাঁদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন। এ প্রেক্ষাপটে সব পেশাজীবীকে নিয়ে এক মতবিনিময় সভার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগির এ সভার আয়োজন করবেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে সব পেশার প্রতিনিধি থাকবেন এ সভায়। বিভিন্ন দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রকৃচির নেতাদের সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল ২০১৩ সালে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন আন্তঃক্যাডারে বৈষম্য নিরসনের জন্য সব ক্যাডারে প্রথম গ্রেডের পদ সৃষ্টি, সুপারনিউমারারি পদোন্নতি ও পদসোপান তৈরির নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। এ ছাড়া সম্প্রতি জাতীয় সংসদে একাধিক প্রবীণ সংসদ সদস্য সরকারের 'আমলাতন্ত্র-নির্ভরতা' এবং আমলাদের 'কর্তৃত্বপরায়ণ' হয়ে ওঠার সমালোচনা করায় তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে।

প্রকৃচির আহ্বায়ক ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) সভাপতি প্রকৌশলী মো. নূরুল হুদা সমকালকে বলেন, আমলাদের চলমান কার্যক্রমে প্রতিটি সেক্টর ক্ষুব্ধ। তার মানে, প্রকৃত অর্থে এটা একটা বড় সমস্যা। উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সামনের দিকে এগোনোর ক্ষেত্রে এটির সমাধান জরুরি। এসব সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান হতে হবে। তিনি বলেন, এ জন্য প্রকৃচি ও আইইবির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য কয়েকবার চিঠি দিয়েছি। কিন্তু চিঠিগুলো তাঁর হাতে গেছে কিনা আমরা জানি না। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দায়িত্ব নিয়েছেন। পেশাজীবীদের জটিল বিষয়গুলো নিয়ে তিনি কথা বলবেন। এরপর আমাদের নিয়ে বড় আকারে বসবেন। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সব পেশার মানুষকে নিয়েও বসার উদ্যোগ রয়েছে।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সমকালকে বলেন, একটা রাষ্ট্রের কাঠামো কী হবে, সরকারের কাঠামো কী হবে, সরকারের নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কার কী ভূমিকা হবে, রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষই এটা নির্ধারণ করে। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবেই আসে। তবে যেখানে আইনের মাধ্যমে দায়িত্বের পরিধি নির্ধারণ করা হয়- সে বিষয়ে সংসদে সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সুপারিশ করেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মেজর পলিসির সিদ্ধান্ত নেয়। মন্ত্রণালয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন মন্ত্রী। রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ যেটা সমীচীন মনে করে, সেটাই দেশ ও জনগণের কল্যাণে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে সবাই পরামর্শ, সুপারিশ দাবি-দাওয়া করতে পারেন। সরকারের বাইরে যাঁরা আছেন, তাঁরাও বলতে পারেন। লেখক, বুদ্ধিজীবীসহ সবাই পরামর্শ দেন। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ। যুব ও ক্রীড়া সচিব এবং অফিসার্স ক্লাবের (ঢাকা) সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন সমকালকে বলেন, এগুলো সরকারের ব্যাপার, সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। আমার কিছু বলার নেই।

চায় কৃত্যপেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয়: প্রকৃচির প্রধান দাবি কৃত্যপেশাভিত্তিক প্রশাসন ও মন্ত্রণালয় গঠন করা। সংগঠনটির দাবি, আমলাতন্ত্রের নামে পেশাজীবীদের শোষণের যে ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে, তা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ কৃত্যপেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা। এটা না হলে টেকসই উন্নয়নের নিরলস প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হবে। এতে ক্যাডার যার, মন্ত্রণালয় হবে তাঁর। এ ছাড়া প্রশাসনের সব স্তরে জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায়ন, অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাগুলোর প্রধান পদে সংশ্নিষ্ট পেশায় অভিজ্ঞদের নিয়োগ প্রদানসহ বিভিন্ন প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক পদে প্রকৌশলীদের পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পেশাজীবী ক্যাডার পদ সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে প্রশাসন ক্যাডারের মতো আনুপাতিক হারে 'গ্রেড-১' ও তদানুযায়ী 'গ্রেড-২' ও গ্রেড-৩'-এর পদসংখ্যা নির্ধারণ করে পদ সৃজন, প্রতিটি পেশার ক্যাডার সংখ্যার আনুপাতিক হারে সিনিয়র সচিব সমমান পদ সৃজন ও প্রশাসন ক্যাডারের মতো অন্যান্য ক্যাডারের সমস্কেল/গ্রেডের কর্মকর্তাদের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। গ্রেড-৫ পর্যন্ত কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষমতা সংশ্নিষ্ট অধিদপ্তর/সংস্থা প্রধানদের প্রদান করাসহ ২৮টি দাবি জানিয়েছে প্রকৃচি।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, আমলাতন্ত্রের নির্ভরতা কমাতে পেশাভিত্তিক গুচ্ছ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ করে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ দীর্ঘদিনের। কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন না হওয়ায় পেশাজীবীদের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। অধিদপ্তরগুলোকে স্বাধীন করে স্ব স্ব ক্যাডার কর্মকর্তাদের কাজের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমলাতন্ত্রে পদের চেয়ে কর্মকর্তা বেশি হওয়ায় তাঁদের অভিজ্ঞতা না থেকেও বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এতে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের ক্ষোভ বাড়ছে। তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ের কাজের ক্ষেত্রে সিনিয়র কর্মকর্তাদের সম্মান দিয়ে কাজ করতে হবে জেলা প্রশাসকদের। এসব সমস্যা সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে।

আরও পড়ুন

×