ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কাগজের দাম এখনও নাগালের বাইরে

কাগজের দাম এখনও নাগালের বাইরে
×

সাব্বির নেওয়াজ

প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০২২ | ২১:৪৪

গত ৮ থেকে ১০ মাস ধরেই বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সব ধরনের কাগজের দাম। বর্তমান দাম সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে কমার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। বিক্রেতারা বলছেন, কাঁচামালের অভাবে দেশে কাগজ উৎপাদন কমে গেছে। এতে বেড়েছে দাম। আর কাগজ ব্যবহারকারী ও মুদ্রণশিল্প-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, দেশীয় কাগজ কলগুলো কাঁচামাল ইচ্ছাকৃতভাবে কম আমদানি করছে। এভাবে সংকট জিইয়ে রেখে বাজারে উচ্চমূল্য ধরে রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া কাগজের বাজারেও ঢুকে গেছে সিন্ডিকেট। এভাবে চলতে থাকলে নতুন বছরে দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষার প্রধান উপকরণ বই এবং খাতা হাতের নাগালে পেতে ব্যর্থ হবে। কাগজের দাম বাড়ার কারণে এসএসসি পরীক্ষার ফিও বাড়িয়ে দিয়েছে দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলো। শঙ্কা তৈরি হয়েছে অমর একুশের বইমেলা নিয়েও।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশি দামেই কাগজ কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। অথচ গত বছর এই সময়ও কাগজের দাম স্বাভাবিক ছিল। গত ডিসেম্বরে ৮০ গ্রাম অফসেট ডাবল ডিমাই (ডিডি সাইজ) কাগজের দাম ছিল ১ হাজার ৫০০ টাকা রিম, বর্তমানে তা ৩ হাজার টাকার বেশি। ১০০ গ্রামের একই কাগজের যেখানে গতবার দাম ছিল ১ হাজার ৭৫০ টাকা রিম, এখন তার দাম ৪ হাজার ২০০ টাকা। ২০ বাই ৩০ সাইজের নিউজপ্রিন্ট ডাবল ক্রাউন (ডিসি সাইজ) কাগজের রিমপ্রতি দাম ছিল ৩৮০ টাকা, এ বছর তা ১ হাজার টাকা। একই কাগজের ডিসি সাইজের দাম গত বছর ৪৪৫ টাকা রিম হলেও এখন তার দাম ১ হাজার ১৮০ টাকা। অস্বাভাবিক দামের কারণে ২০২৩ সালের অমর একুশে বইমেলাও এখন ঝুঁকির মুখে। বই ছাপানোর সাদা কাগজ গত আট মাসে রিমপ্রতি দাম বেড়েছে ১ হাজার ৯০০ টাকা। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলায় কাগজের (৮০ গ্রাম) দাম রিমপ্রতি ছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। সেটির বর্তমান দাম ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা। এ ছাড়া আগের দিনের দামের সঙ্গে পরের দিনের দাম মেলে না। এমন পরিস্থিতিতে সীমাহীন বিপাকে পড়েছেন প্রকাশকরা।

কাগজের দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিক্ষার অন্যতম উপকরণ খাতার দামও। বই ও খাতার পাশাপাশি কলম, ক্যালকুলেটর, জ্যামিতিবক্সসহ অন্য উপকরণগুলোর দামও ঊর্ধ্বমুখী।
কাগজের দাম বাড়ায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে। ২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণে প্রতি পত্রের ফি এ কারণে ১০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। আগে পত্রপ্রতি ১০০ টাকা ফি নেওয়া হলেও ২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে ফি দিতে হবে ১১০ টাকা করে। এসএসসিতে বিভিন্ন বিষয়ে ১২টি পত্রের পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় পরীক্ষার্থীদের। সে হিসাবে কাগজের দাম বাড়ার কারণে ফরম পূরণে অতিরিক্ত ১২০ টাকা গুনতে হবে ছাত্রছাত্রীদের।

এদিকে, বাজারে কাগজের দাম বাড়াকে 'অস্বাভাবিক' আখ্যায়িত করে পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতারা বলছেন, এর পেছনে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। তারা মজুতদারি করছে। বাজারকে প্রভাবিত করে তারা মুনাফা লুটছে। অবিলম্বে কাগজের দাম না কমালে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সব ধরনের প্রকাশনা শিল্পে।

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি আরিফ হোসেন ছোটন সমকালকে বলেন, দেশের বাজারে এখন মুদ্রণ ও লেখার কাগজের যে সংকট চলছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে কাগজের আকাশচুম্বী দাম বাড়া অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এর প্রভাব দেশের কোটি কোটি কোমলমতি শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনে যেমন বিঘ্ন ঘটাবে, তেমনি বইমেলায় এর প্রভাব পড়তে বাধ্য।

কাগজকল মালিকদের সঙ্গে নভেম্বরের শুরুতে বৈঠকে বসেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। সেখানে কাগজকল মালিকরা জানান, ডলার সংকটের কারণে পাল্প আমদানি করার জন্য এলসি খোলা যাচ্ছে না। খুলতে পারলেও ব্যাংকগুলো তিন মাস পর আমদানি বিল পরিশোধ করতে চায়। এতে বিক্রেতারা রাজি হননি। ফলে কাঁচামালের অভাবে মিলগুলো ধুঁকছে।

পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সাবেক সভাপতি আলমগীর সিকদার লোটন সমকালকে বলেন, নানা ব্যয় বাড়ার কারণে কাগজের দাম যে মাত্রায় বাড়তে পারত, বাস্তবে তা বেড়েছে খুবই অস্বাভাবিক মাত্রায়। বর্তমানে বাড়ার এ হার ক্ষেত্র বিশেষে দ্বিগুণ বা তারও বেশি।
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অন্যপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম বলেন, ভারতে গত বছর এ সময়ে কাগজের রিম ছিল তিন হাজার টাকা। এখন সেই কাগজের দাম চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা। কিন্তু আমাদের দেশে দাম বেড়েছে দুই থেকে তিন গুণ। একটি সুযোগসন্ধানী চক্র এর পেছনে কাজ করছে। এক মিল মালিক দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অন্যগুলোও দাম বাড়াচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এর বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না, সেটি আমাদের জানা নেই।

পুঁথি নিলয়ের স্বত্বাধিকারী শ্যামল পাল বলেন, বাজারে কাগজের সংকট পুরোপুরি 'কৃত্রিম'। কারণ, বাড়তি দাম দিলেই তো কাগজ মিলছে। কাগজের বাজারে সিন্ডিকেট কাজ করছে।

আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গনি বলেন, সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বাজারে কাগজের চাহিদা বেশি থাকে। গত দুই-আড়াই বছর কভিড পরিস্থিতির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায়, প্রতি বছর যে ওয়েস্টেজ কাগজকে রিসাইকেলযোগ্য কাঁচামাল হিসেবে কাগজকলের জন্য পাওয়া যায়, সেটা এবার পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিদেশ থেকে কাগজের আমদানি শুল্ক্ক যদি কমানো না হয়, তাহলে খুব শিগগির কাগজের বাজারে বেসামাল অবস্থার সৃষ্টি হবে।

অনুপম প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মিলন নাথ বলেন, কাগজের অস্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণহীন দাম বাড়াকে কেন্দ্র করে দেশের পুরো প্রকাশনা খাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। একই সঙ্গে যোগ হয়েছে আমদানিনির্ভর প্লেটের দুষ্প্রাপ্যতা।

আরও পড়ুন

×