ঢাকা
দুঃসময়ের একদিন
×
সুমন্ত আসলাম
প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২০ | ১৩:২৩
'কিছুক্ষণ আগে একজন ১০ কেজি লবণ কিইন্যা নিয়া গেছে!' মুদি দোকানি আলতাফ হাসতে হাসতে বলল, 'কাল দুই বস্তা পেঁয়াজ নিছে আরেকজন।'
হাসিটা আকর্ণ ছড়াল আলতাফের। কিন্তু দমে যাই আমি। পাশেই মুরগির বাজার। বেশ ভিড় সেখানেও।
সবজির বাজারে সবকিছুর দাম বাড়লেও সবচেয়ে বেশি বেড়েছে লেবুর। ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি এক হালি কিনতে নিয়েই দুটো কিনে হাসি দিলেন সন্তুষ্টির। মাছের বাজারে মাছ কম, বিক্রিও কম। বিশাল এক কাতলা দেখিয়ে মাছ বিক্রেতা বললেন, 'বহুত টেস হইবো ছার, নিয়া যান, নদীর।' আর রাজ্জাকের দোকানে মাংসের ক্রেতা অনেকটা শূন্য। আগে দিনে ছয়টা জবাই হতো, এখন দুটো। মাথার টুপিটা সোজা করতে করতে কিছুটা ফিসফিস করে রাজ্জাক বললেন, 'ছার, গরুর গোস্তে কি করোনা থাকে?' চালের দোকানি আলাউলের আক্ষেপ, 'এ কয়দিনে একেকজনের কাছে যে পরিমাণ চাইল বেচছি, অনেকেই তা শেষ করতে পাইরব না, পোকায় ধরব!'
২
মানুষের একটা হাট আছে মিরপুরের পূরবী সিনেমা হলের বিপরীত রাস্তায়। মাটি কাটা, ঘরে রং করা, ছোটখাটো কাজ করা হরেক মানুষ বসে থাকেন এখানে, পাশে কাজ করার প্রয়োজনীয় জিনিস। চল্লিশজন মানুষের মধ্যে মাত্র পাঁচজনের মুখে মাস্ক। অপেক্ষাকৃত প্রবীণ মানুষটার সামনে দাঁড়ালাম, 'মাস্ক পরেননি কেন?'
ঘোলাটে চোখে ভাবলেশহীন তাকিয়ে রইলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর দূরাগত গলায় বললেন, 'করুনা আমাগো হইব না, ওগুলা বড়লোক গো অসুখ।'
'সকালে কী খেয়েছেন?'
'একটা বনরুটি, চা দিয়া।'
'পেট ভরেছে?'
'চার দিন ধইর্যা কাজ নাই। দু-একদিন পর না খাইয়া থাইকতে হইবো।' দীর্ঘশ্বাসের বাতাসগুলো কেমন ভারী হয়ে ওঠে। সফেদ দাড়িগুলো বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে সায় দেয় তার।
ইলিয়াস মোল্লা বস্তিতে যত মেয়ে মানুষ থাকেন, তাদের অধিকাংশই আশপাশের বাসায় বুয়ার কাজ করেন। অনেককে ছুটি দেওয়া হয়েছে। অবশ্য বেতন কাটা যাবে না কারও। এই আনন্দময় খবরেও বিষাদ তাদের স্বর, 'আমরা বাচমু তো!' বাঁচার আকুতি সবার চোখে। পাশ দিয়ে যাওয়া প্রতিবন্ধী বারেক তার লোহার গাড়িটা ঠেলতে ঠেলতে টলায়মান পায়ে থমকে দাঁড়ায়। প্রতিদিনের মতো কপালের ঠিক ওপরে, মাথার ওপর দিকে হাত ঠেকিয়ে সালাম দেয়। অভ্যস্ততায় জিজ্ঞেস করি, 'কামাই কেমন?' মানুষের দেওয়া টাকা-পয়সাগুলো যে ব্যাগে রাখে, তা উল্টিয়ে দেখায় সে, সঙ্গে উল্টায় ঠোঁটও- কামাই কমে গেছে।
৩
সুলতান মোল্লার মার্কেটের সিঁড়িতে বসে আছেন রোকেয়া। কোনোদিন তিনি সখিনা, কোনোদিন ববিতা। অর্ধপাগল। একেকদিন একেক নাম তার। শুয়ে থাকে, ঘুমায়, খায়, মুক্তমনে কাকে যেন গালাগাল করে অবাধ স্বাধীনতায়।
'কেমন আছেন?'
'বালো। ট্যাকা দে।'
যথারীতি দশ টাকার একটা নোট হাতে দেই তার। তাচ্ছিল্যতা নিয়ে পাশে ছুড়ে রেখে দিয়ে হাত ঢুকালেন পাশে রাখা ছোট পোঁটলাতে। একটা চিরুনি বের করলেন, উঁকুন বাছার।
'সবার তো অসুখ হচ্ছে।'
'আমারও হইছে।'
'কী অসুখ হইছে?'
'প্যাটের অসুখ, খালি খিদা লাগে।' মাছির পদভারে আক্রান্ত একটা কেক নিলেন কোলের কাছ থেকে। ছোট্ট করে একটা কামড় দিয়ে বললেন, 'ওই কু... বাচ্চা, চা দে।' ওপাশের রাস্তার চায়ের দোকানের দিকে তাকালেন রোকেয়া। করোনাকে কী অবলীলায় করুণা করে শুয়ে পড়লেন আবার সিঁড়িতে।
৪
মিরপুর-১২ নম্বরের ট্রাফিক স্ট্যান্ডটা যথারীতি আজও খালি। প্রায় দিনই ওখানে কোনো ট্রাফিক পুলিশ থাকে না, আজও নেই। প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝে তারা ওপাশের দোকানে গিয়ে চা-সিগারেট খায়, দোকানে বাজানো রেডিওতে বাংলা সিনেমার গান শোনে। কয়দিন ধরে রাস্তায় গাড়ি খুব কম, এখন ডবল পান খাচ্ছেন, অতিরিক্ত সময় নিয়ে গান শুনছেন।
মেট্রোরেলের বড় বড় লোহার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন এক নারী। বিরস বদন।
'কোথায় যাবেন?'
'মাওনা।'
'গাড়ি নাই?'
'এক ঘণ্টা ধরে দাঁড়ায়া আছি, গাড়ি নাই।'
রাস্তায় সত্যি গাড়ি কম, কয়দিনের চেয়ে আজ আরও কম। ছয়টা বাচ্চা বিয়ানো যে স্বাস্থ্যবান কুকুরটা দেখলেই এগিয়ে আসে লেজ নাড়াতে নাড়াতে, আজ এলো না। কয়দিন ধরে সব বাচ্চা হারানো এই মা-কুকুরটা কেমন ঝিমাচ্ছে। তার ঠিক কয়েক হাত ফাঁকে কিছুটা জমানো পানি, তাতে ডুবে আছে একটা ইঁদুর। মরে ফুলে গেছে, তাকে ঘিরে আনন্দে লাফাচ্ছে মাছিসকল। একটা প্রাণী মারা গেছে, তাকে ঘেঁষে অনেকে পার হচ্ছেন রাস্তা, যাচ্ছেন এদিক-সেদিক। কিন্তু গত কয়দিনে এই পৃথিবীতে বেশ কিছু মানুষ মারা গেছেন, যাদের তার স্বজনরা ছুঁয়ে দেখেননি, দেখতেও যাননি তাদের। আসা-যাওয়ার একাকিত্বের অমোঘ নিয়মের মতো একাই গিয়েছেন তারা। নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবি মানুষের এই করুণ পরিণতিতে কেবল মানুষ কাঁদছে না এখন, সম্ভবত আর কেউও কাঁদছে, গুনগুনিয়ে কাঁদছে।
অথচ সেই কান্না আমরা শুনতে পাচ্ছি না। কারণ প্রকৃতির কান্না সবাই শুনতে পায় না। সেই কান্না শোনার জন্য মন লাগে। সেই মন আমরা হারিয়ে ফেলেছি অনেক আগেই।
হাসিটা আকর্ণ ছড়াল আলতাফের। কিন্তু দমে যাই আমি। পাশেই মুরগির বাজার। বেশ ভিড় সেখানেও।
সবজির বাজারে সবকিছুর দাম বাড়লেও সবচেয়ে বেশি বেড়েছে লেবুর। ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি এক হালি কিনতে নিয়েই দুটো কিনে হাসি দিলেন সন্তুষ্টির। মাছের বাজারে মাছ কম, বিক্রিও কম। বিশাল এক কাতলা দেখিয়ে মাছ বিক্রেতা বললেন, 'বহুত টেস হইবো ছার, নিয়া যান, নদীর।' আর রাজ্জাকের দোকানে মাংসের ক্রেতা অনেকটা শূন্য। আগে দিনে ছয়টা জবাই হতো, এখন দুটো। মাথার টুপিটা সোজা করতে করতে কিছুটা ফিসফিস করে রাজ্জাক বললেন, 'ছার, গরুর গোস্তে কি করোনা থাকে?' চালের দোকানি আলাউলের আক্ষেপ, 'এ কয়দিনে একেকজনের কাছে যে পরিমাণ চাইল বেচছি, অনেকেই তা শেষ করতে পাইরব না, পোকায় ধরব!'
২
মানুষের একটা হাট আছে মিরপুরের পূরবী সিনেমা হলের বিপরীত রাস্তায়। মাটি কাটা, ঘরে রং করা, ছোটখাটো কাজ করা হরেক মানুষ বসে থাকেন এখানে, পাশে কাজ করার প্রয়োজনীয় জিনিস। চল্লিশজন মানুষের মধ্যে মাত্র পাঁচজনের মুখে মাস্ক। অপেক্ষাকৃত প্রবীণ মানুষটার সামনে দাঁড়ালাম, 'মাস্ক পরেননি কেন?'
ঘোলাটে চোখে ভাবলেশহীন তাকিয়ে রইলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর দূরাগত গলায় বললেন, 'করুনা আমাগো হইব না, ওগুলা বড়লোক গো অসুখ।'
'সকালে কী খেয়েছেন?'
'একটা বনরুটি, চা দিয়া।'
'পেট ভরেছে?'
'চার দিন ধইর্যা কাজ নাই। দু-একদিন পর না খাইয়া থাইকতে হইবো।' দীর্ঘশ্বাসের বাতাসগুলো কেমন ভারী হয়ে ওঠে। সফেদ দাড়িগুলো বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে সায় দেয় তার।
ইলিয়াস মোল্লা বস্তিতে যত মেয়ে মানুষ থাকেন, তাদের অধিকাংশই আশপাশের বাসায় বুয়ার কাজ করেন। অনেককে ছুটি দেওয়া হয়েছে। অবশ্য বেতন কাটা যাবে না কারও। এই আনন্দময় খবরেও বিষাদ তাদের স্বর, 'আমরা বাচমু তো!' বাঁচার আকুতি সবার চোখে। পাশ দিয়ে যাওয়া প্রতিবন্ধী বারেক তার লোহার গাড়িটা ঠেলতে ঠেলতে টলায়মান পায়ে থমকে দাঁড়ায়। প্রতিদিনের মতো কপালের ঠিক ওপরে, মাথার ওপর দিকে হাত ঠেকিয়ে সালাম দেয়। অভ্যস্ততায় জিজ্ঞেস করি, 'কামাই কেমন?' মানুষের দেওয়া টাকা-পয়সাগুলো যে ব্যাগে রাখে, তা উল্টিয়ে দেখায় সে, সঙ্গে উল্টায় ঠোঁটও- কামাই কমে গেছে।
৩
সুলতান মোল্লার মার্কেটের সিঁড়িতে বসে আছেন রোকেয়া। কোনোদিন তিনি সখিনা, কোনোদিন ববিতা। অর্ধপাগল। একেকদিন একেক নাম তার। শুয়ে থাকে, ঘুমায়, খায়, মুক্তমনে কাকে যেন গালাগাল করে অবাধ স্বাধীনতায়।
'কেমন আছেন?'
'বালো। ট্যাকা দে।'
যথারীতি দশ টাকার একটা নোট হাতে দেই তার। তাচ্ছিল্যতা নিয়ে পাশে ছুড়ে রেখে দিয়ে হাত ঢুকালেন পাশে রাখা ছোট পোঁটলাতে। একটা চিরুনি বের করলেন, উঁকুন বাছার।
'সবার তো অসুখ হচ্ছে।'
'আমারও হইছে।'
'কী অসুখ হইছে?'
'প্যাটের অসুখ, খালি খিদা লাগে।' মাছির পদভারে আক্রান্ত একটা কেক নিলেন কোলের কাছ থেকে। ছোট্ট করে একটা কামড় দিয়ে বললেন, 'ওই কু... বাচ্চা, চা দে।' ওপাশের রাস্তার চায়ের দোকানের দিকে তাকালেন রোকেয়া। করোনাকে কী অবলীলায় করুণা করে শুয়ে পড়লেন আবার সিঁড়িতে।
৪
মিরপুর-১২ নম্বরের ট্রাফিক স্ট্যান্ডটা যথারীতি আজও খালি। প্রায় দিনই ওখানে কোনো ট্রাফিক পুলিশ থাকে না, আজও নেই। প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝে তারা ওপাশের দোকানে গিয়ে চা-সিগারেট খায়, দোকানে বাজানো রেডিওতে বাংলা সিনেমার গান শোনে। কয়দিন ধরে রাস্তায় গাড়ি খুব কম, এখন ডবল পান খাচ্ছেন, অতিরিক্ত সময় নিয়ে গান শুনছেন।
মেট্রোরেলের বড় বড় লোহার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন এক নারী। বিরস বদন।
'কোথায় যাবেন?'
'মাওনা।'
'গাড়ি নাই?'
'এক ঘণ্টা ধরে দাঁড়ায়া আছি, গাড়ি নাই।'
রাস্তায় সত্যি গাড়ি কম, কয়দিনের চেয়ে আজ আরও কম। ছয়টা বাচ্চা বিয়ানো যে স্বাস্থ্যবান কুকুরটা দেখলেই এগিয়ে আসে লেজ নাড়াতে নাড়াতে, আজ এলো না। কয়দিন ধরে সব বাচ্চা হারানো এই মা-কুকুরটা কেমন ঝিমাচ্ছে। তার ঠিক কয়েক হাত ফাঁকে কিছুটা জমানো পানি, তাতে ডুবে আছে একটা ইঁদুর। মরে ফুলে গেছে, তাকে ঘিরে আনন্দে লাফাচ্ছে মাছিসকল। একটা প্রাণী মারা গেছে, তাকে ঘেঁষে অনেকে পার হচ্ছেন রাস্তা, যাচ্ছেন এদিক-সেদিক। কিন্তু গত কয়দিনে এই পৃথিবীতে বেশ কিছু মানুষ মারা গেছেন, যাদের তার স্বজনরা ছুঁয়ে দেখেননি, দেখতেও যাননি তাদের। আসা-যাওয়ার একাকিত্বের অমোঘ নিয়মের মতো একাই গিয়েছেন তারা। নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবি মানুষের এই করুণ পরিণতিতে কেবল মানুষ কাঁদছে না এখন, সম্ভবত আর কেউও কাঁদছে, গুনগুনিয়ে কাঁদছে।
অথচ সেই কান্না আমরা শুনতে পাচ্ছি না। কারণ প্রকৃতির কান্না সবাই শুনতে পায় না। সেই কান্না শোনার জন্য মন লাগে। সেই মন আমরা হারিয়ে ফেলেছি অনেক আগেই।
- বিষয় :
- করোনাযুদ্ধ
