ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

বিশেষজ্ঞ মত

চাই মানসম্পন্ন চিকিৎসা সামগ্রী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা

চাই মানসম্পন্ন চিকিৎসা সামগ্রী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা
×

অধ্যাপক ডা. আলী হোসেন বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২০ | ১২:৪২ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

যে কোনো ভাইরাল সংক্রমণে ফুসফুস আক্রান্ত হয়। তাকে এআরডিএস বলা হয়। এ কারণেই শ্বাসকষ্ট হয়। এই ভাইরাস এমন কিছু পদার্থ নিঃসরণ করে, যা ফুসফুসের যেখানে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিবর্তিত হয় সেই মেমব্রেন ক্ষতিগ্রস্ত করে। তখন অক্সিজেন বাতাস থেকে রক্তে যেতে পারে না, আর কার্বন ডাই-অক্সাইড রক্ত থেকে ফুসফুসে ঢুকতে পারে না। অর্থাৎ, কার্বন ডাই-অক্সাইড আর অক্সিজেনের আদান-প্রদান বাধা পায়। তখন শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এ ধরনের সংক্রমণে ৯৫ শতাংশের বেশি রোগী দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে শ্বাসকষ্ট ও কাশি থেকে পর্যায়ক্রমে সুস্থ হয়। ২ থেকে ৩ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে অবস্থা মারাত্মক হতে পারে। তখন অক্সিজেন দিতে হয়। এ সময় রক্তে যেন ৯০ শতাংশের ওপর অক্সিজেন থাকে সেদিকে খেয়াল রাখা হয়। এ ধরনের রোগীকে নেজাল ক্যানুলা দিয়ে প্রাথমিকভাবে অক্সিজেন দেওয়া হয়। এতেও যদি অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়, রক্তে ৯০ শতাংশ অক্সিজেন যদি না থাকে তাহলে ফেস মাস্ক বা নেজাল ক্যানুলা দিয়ে বেশি করে অক্সিজেন (হাই ফ্লো) দেওয়া হয়। যেসব রোগীর ক্ষেত্রে হাই ফ্লো অক্সিজেন দিয়েও কাজ হয় না, তাদের ক্ষেত্রে নন ইনভেনসিভ ভেন্টিলেটর ব্যবহার করা হয়। এতেও অবস্থার উন্নতি না হলে তখন ভেন্টিলেটর ব্যবহার করা হয়।
তবে করোনোভাইরাসের সংক্রমণের ক্ষমতা যেহেতু খুব বেশি, তাই এ ক্ষেত্রে হাই ফ্লো অক্সিজেন দিতে হয় হেলমেট অথবা পুরো মুখমণ্ডল ঢাকা (ফুল ফেস) মাস্ক দিয়ে। করোনা রোগীর ক্ষেত্রে নন ইনভেনসিভ ভেন্টিলেটর ব্যবহারের সমস্যা হচ্ছে, এতে যারা সেবা দিচ্ছেন, সেসব স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হতে পারেন। এজন্য যেসব রুমে নেগেটিভ প্রেসার ভেন্টিলেটর আছে, সেখানে এমন রোগীদের নন ইনভেনসিভ ভেন্টিলেটরের অক্সিজেন দিতে হবে, একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের পূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা (পিপিই) পরতে হবে, ফুলফেস মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। অন্যান্য শ্বাসকষ্টের রোগীর সঙ্গে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার পার্থক্য এটি।
করোনা আক্রান্ত রোগীর জন্য বাড়তি সতর্কতামূলক সুরক্ষা ব্যবস্থা মেনে চলতে হয়। কিন্তু এমন সুরক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশের খুব কম হাসপতালে আছে। এজন্য আমাদের দেশে করোনা রোগীদের ক্যানুলা বা ফেস মাস্ক দিয়ে অক্সিজেন দিতে হবে। অবস্থার অবনতি হলে ভেন্টিলেটর ব্যবহার করতে হবে। রোগীর অবস্থার উন্নতি হলে ভেন্টিলেটর সরিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো, হুট করে যদি রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়, তবে অন্যান্য অঙ্গও আক্রান্ত হয়। যেমন কিডনি, লিভার, ব্রেইন আক্রান্ত হতে পারে। যদিও করোনা সংক্রমণে এ ধরনের ঘটনার হার কম, শতকরা ৫ ভাগের নিচে, তার পরও বিষয়টা খুব স্পর্শকাতর। কারণ এমন রোগীদের উন্নত যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ ইউনিটে সেবা দিতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বেসরকারি এমনকি সরকারি হাসপাতাগুলোর আইসিইউতেও এমন সুবিধা কম। এসব আইসিইউতে যদি নেগেটিভ প্রেসার ভেন্টিলেটর না থাকে তাহলে করোনা রোগী যে শ্বাস ত্যাগ করবে তার মাধ্যমে করোনাভাইরাস রুমের বাতাসে ঘুরে বেড়াবে। ফলে সেখানে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীরা যতই সুরক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে থাকুক কম-বেশি আক্রান্ত হবে।
বিশ্বের অন্য দেশে বয়স্ক লোকেরা কভিড-১৯-এ বেশি আক্রান্ত হলেও বাংলাদেশে ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের আক্রান্তের হার বেশি। এর কারণ হলো চীন, ইতালি থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে বয়স্করা ঘরে অবস্থান করছে। তরুণরা হোম কোয়ারেন্টাইন মানছে না। বাইরে বেশি বেরোচ্ছে। তাই তারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। কারও যদি হাইপ্রেসার থাকে, ডায়াবেটিস থাকে, অ্যাজমা থাকে তাহলে করোনা তাদের জন্য ক্ষতিকর বেশি। যার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি, তার কভিড-১৯ থেকে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। করোনা আক্রান্তদের সেবা করতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন। কারণ তাদের সুরক্ষা ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে। এসব পিপিই ওয়াটপ্রুফ হতে হবে এবং একবারের বেশি ব্যবহার করা যাবে না। সঙ্গে এন-৯৫ মাস্ক, স্ট্যান্ডার্ড গগলস ও গ্লাভস থাকতে হবে। কিন্তু এখানে বলা হচ্ছে ওয়াশেবল পিপিই। সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে স্বাস্থ্যকর্মীরা একই সুরক্ষাসামগ্রী কয়েকবার ব্যবহার করছে। ফলে যেসব স্বাস্থ্যকর্মী প্রথমেই করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসছেন, তারা দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছেন। কারণ কোনো স্বাস্থ্যকর্মী মাস্ক খুলে পানি পান করলেই তাকে আবার নতুন মাস্ক পরতে হবে। না হলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
এখন দেশে যেসব পিপিই তৈরি হচ্ছে সেসব মূলত প্যারাসুট কাপড়ের। ফলে এগুলো মানসম্মত হচ্ছে না। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, গণমাধ্যমকর্মীসহ যারা মাঠে কাজ করছেন তাদেরও পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে হবে। কেউ মারা গেলে তিন-চার ঘণ্টা পর ভাইরাস নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে যায়। ফলে জীবিত ব্যক্তির মতো মরদেহ তেমন সংক্রামক নয়। সঠিক ব্যাগে ভরে মরদেহ কবরস্থ করলে সংক্রমণের তেমন ঝুঁকি নেই।


আরও পড়ুন

×