করোনাযোদ্ধার সুরক্ষা চাই
রাজবংশী রায়
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২০ | ১৪:০৯ | আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২০ | ২০:৪৮
প্রাণঘাতী করোনাযুদ্ধে হেরে না ফেরার দেশে চলে গেলেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিন। গতকাল বুধবার সকাল পৌনে ৮টায় রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। তিনি ওসমানী হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডের নেতৃত্বে ছিলেন। করোনা প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিজেই কখন সংক্রমিত হয়েছিলেন, তা বুঝতে পারেননি এই চিকিৎসক। এপ্রিলের শুরুর দিকে কাশির পাশাপাশি জ্বর অনুভব করার এক পর্যায়ে নিজের নমুনা পরীক্ষা করান। গত ৫ এপ্রিল তার শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এর পর থেকে তিনি বাসায় অবস্থান করেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় ৭ এপ্রিল তাকে নগরীর শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় সেখানে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। পরে ঢাকায় এনে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। টানা ১০ দিনের লড়াইয়ে হেরে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন এই করোনাযোদ্ধা। তার মৃত্যুতে সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এনিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে।
ডা. মঈন উদ্দিনের মৃত্যুর পাশাপাশি আরও ৯০ স্বাস্থ্য কর্মীর আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এতে করোনা প্রতিরোধ যুদ্ধের অগ্রভাগে থাকা চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ স্বাস্থ্য কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল থেকে তাদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। অন্যথায় দেশে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম গতকাল সমকালকে বলেন, এই মুহূর্তে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্য কর্মীরাই সামনে থেকে করোনা প্রতিরোধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। করোনায় আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি শনাক্ত হলে তার চিকিৎসার দায়িত্ব পড়ছে চিকিৎসকের ওপর। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ স্বাস্থ্য কর্মীরা। এসব রোগীর সার্বক্ষণিক সেবা-শুশ্রূষার দায়িত্ব পালন করছেন নার্সরা। কিন্তু সেবা দিতে গিয়ে একের পর এক চিকিৎসা কর্মী আক্রান্ত হতে থাকলে এর পর তো চিকিৎসা দেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ কাজে যে কোনো ধরনের শিথিলতা চরম বিপদ ডেকে আনতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঠ পর্যায়ে সামাজিক দূরত্ব ও হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে কাজ করছেন। গণমাধ্যম কর্মীরা খবর সংগ্রহের জন্য হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে ছুটে বেড়াচ্ছেন। ব্যাংক কর্মীরাও এই দুঃসময়ে মানুষের সেবা দিচ্ছেন। এসব পেশার বেশ কিছু ব্যক্তির আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল পর্যন্ত সারাদেশে ১ হাজার ২৩১ জনের শরীরে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইইডিসিআর ও চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন ৫২ চিকিৎসক, ৫ আইইডিসিআর কর্মী, ২৮ নার্স, ৪ টেকনোলজিস্টসহ মোট ৯০ জন স্বাস্থ্য কর্মী, যা মোট আক্রান্তের ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ। এর বাইরে ৬ গণমাধ্যম কর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭ সদস্য, ৫ ব্যাংক কর্মী আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে স্বাস্থ্য কর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিশেষ উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে ইউরোপের দেশ ইতালিতে ১০ শতাংশ এবং চীনে ৪ শতাংশ স্বাস্থ্য কর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। উন্নত ব্যবস্থাপনা থাকার পরও সেসব দেশে স্বাস্থ্য কর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশের চলমান অব্যবস্থাপনার চিত্র উদ্বেগ জাগায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএমএ মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী সমকালকে বলেন, বিএমএ খোঁজ নিয়ে ৫২ জন চিকিৎসক আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পেয়েছে। এখনও সারাদেশের তথ্য এসে পৌঁছেনি। আক্রান্ত সবাই করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসার কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী থাকার পরও এসব চিকিৎসক কীভাবে আক্রান্ত হলেন- এমন প্রশ্নে ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস, গগলসসহ বিভিন্ন সুরক্ষাসামগ্রী আনা হচ্ছে। কিন্তু একটি সামগ্রীও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শর্ত পূরণ করে না। তাহলে কেন এসব সামগ্রী কেনা হলো- এ প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এর পেছনে কার বা কাদের স্বার্থ রয়েছে, তা খুঁজে বের করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, দুর্যোগকে কাজে লাগিয়ে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। কিন্তু কেনাকাটার নামে তো দুর্নীতির মহোৎসব চলছে। এই দুর্নীতিবাজরা মানহীন চিকিৎসা সুরক্ষাসামগ্রী কিনে তা সারাদেশে সরবরাহ করার মাধ্যমে হাজার হাজার চিকিৎসা কর্মীর জীবন হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এর দায় তাদের নিতে হবে। মানসম্পন্ন চিকিৎসা সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করতে তিনি সংশ্নিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।
আইইডিসিআরে আক্রান্ত ৫, অন্যরা কোয়ারেন্টাইনে : গত ৮ এপ্রিল রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ৫ কর্মী আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে দুইজন টেকনোলজিস্ট, অন্যরা স্বাস্থ্যকর্মী। পাঁচজনকেই রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাসহ সব কর্মীকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংলগ্ন পর্যটন করপোরেশনের একটি হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। নাম প্রকাশ করতে না চেয়ে আইইডিসিআরের এক কর্মকর্তা জানান, আক্রান্ত দুই টেকনোলজিস্ট মাঠ পর্যায় থেকে নমুনা সংগ্রহ করতেন। তাদের সংস্পর্শে থাকা আরও ৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এতে তাদের প্রতিষ্ঠানের সবাই এখন কোয়ারেন্টাইনে থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। একটি সূত্র জানায়, ডা. ফ্লোরাসহ অন্যদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের কারও শরীরে করোনার উপস্থিতি মেলেনি।
চিকিৎসক আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইইডিসিআর ও বিএমএ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট ৫২ জন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক এবং রাজধানীর একটি প্রতিষ্ঠানের একজন অর্থোপেডিক সার্জন কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। সর্বশেষ গতকাল বুধবার কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে আরও এক চিকিৎসক আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে হাসপাতালের এক স্বাস্থ্যকর্মীও আক্রান্ত হয়েছেন।
চিকিৎসকদের মধ্যে গত ২২ মার্চ প্রথম রাজধানীর ডেল্টা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এক ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসারের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। ২৪ মার্চ ওই হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধানও আক্রান্ত হন। দু'জনই রাজধানীর টোলারবাগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া এক রোগীর সংস্পর্শে এসেছিলেন। ওই রোগীর সংস্পর্শে আসায় একই হাসপাতালের ১২ নার্স ও ৩ জন স্টাফকে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছিল। ২৬ মার্চ রাজধানীর পপুলার হাসপাতালের এক চিকিৎসকের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়।
ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন, সদর উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন, চাঁদপুরের মতলব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক ও সিলেটে এক চিকিৎসকের শরীরে করোনার সংক্রমণ পাওয়া যায়। এ ছাড়া গত ৯ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালের আক্রান্ত উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার সেলিম আকন্দের মৃত্যু হয়েছে। গত ৭ এপ্রিল নীলফামারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন করে চিকিৎসক আক্রান্ত হন। একই দিনে যশোরে একজন স্বাস্থ্য সহকারী আক্রান্ত হন। ১২ এপ্রিল রাজধানীর ইমপাল্স হাসপাতালের এক নারী চিকিৎসকের শরীরে সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এর পর গত মঙ্গলবার একই হাসপাতালের আরও ৩ চিকিৎসকের শরীরে সংক্রমণ শনাক্ত হয়।
এর বাইরে বিএসএমএমইউর সাবেক এক উপ-উপাচার্য, নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক, ঢাকা শিশু হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের এক সহকারী অধ্যাপকের শরীরে করোনার সংক্রমণ পাওয়া যায়। তার সংস্পর্শে থাকা আরও তিন নার্সের শরীরে সংক্রমণ শনাক্ত হয়। রাজধানীর ইনসাফ বারাকা কিডনি অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে এক চিকিৎসকসহ এ পর্যন্ত দেশে মোট ৫১ চিকিৎসক আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আক্রান্ত নার্স ২৮ জন : বাংলাদেশ নার্সিং অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ইনসাফ বারাকা কিডনি অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল, ইমপালস, ঢাকা শিশু হাসপাতালে তিনজন করে, ঢাকার পপুলার হাসপাতাল ও নরসিংদীতে দু'জন করে, জামালপুর ও নেত্রকোনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, নারায়ণগঞ্জের ভিক্টোরিয়ার আড়াইশ' শয্যার হাসপাতাল, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মিটফোর্ড হাসপাতাল, ডেল্টা হাসপাতাল, অ্যাপেলো হাসপাতাল, বরিশালের বাবুগঞ্জে একজন করে মোট ২৮ নার্স আক্রান্ত হয়েছেন।
নার্সিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইসমত আরা বেগম জানান, চিকিৎসাকর্মীদের সুরক্ষার জন্য যেসব সামগ্রী দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একটিও মানসম্পন্ন নয়। এন-৯৫ মাস্ক কোথাও দেওয়া হয়নি। সার্জিক্যাল মাস্ক পরে স্বাস্থ্যকর্মীরা সেবা দিচ্ছেন। এ ছাড়া পিপিইর নামে যেসব সুরক্ষাসামগ্রী দেওয়া হয়েছে সেগুলোর কোনো গুণগত মান নেই। এতে স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। বিষয়টি তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন। কিন্তু তারা এ বিষয়ে কোনো সুরাহা করেননি।
ইসমত আরা বেগম আরও বলেন, নার্সদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে কোনো আপত্তি নেই। তাদের শুধু সুরক্ষা দিতে হবে। মানসম্পন্ন সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ না করায় তারা সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ৪ জন : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আইইডিসিআরের দু'জন, রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকার একটি বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের একজন এবং বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আক্রান্ত হয়েছেন।
বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব মো. সেলিম মোল্লা সমকালকে বলেন, টেকনোলজিস্টরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে সরবরাহ করে আসছেন। কিন্তু বেশিরভাগ টেকনোলজিস্টকে এখনও পিপিইসহ সুরক্ষাসামগ্রী দেওয়া হয়নি। এতে তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। যে চারজন আক্রান্ত হয়েছেন, তাদেরও যথাযথ সুরক্ষাসামগ্রী ছিল না। নমুনা সংগ্রহকারী টেকনোলজিস্টদের মানসম্পন্ন সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করার জন্য তিনি সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।
গণমাধ্যম কর্মী ছয়জন : ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের এক ক্যামেরাপারসন, যমুনা টেলিভিশনের এক রিপোর্টার, এটিএন নিউজের এক রিপোর্টার, একটি জাতীয় দৈনিকের এক রিপোর্টার, মাছরাঙা টিভির এক কর্মী এবং সর্বশেষ নরসিংদীতে এক সংবাদ কর্মীর শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ১০ জন : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ এপ্রিল ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় এপিবিএনের এক সদস্য আক্রান্ত হন। ১০ এপ্রিল ভৈরব থানার এক উপপরিদর্শক আক্রান্ত হন। ১১ এপ্রিল মানিকগঞ্জে এক পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হন। একই দিন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে এক এবং গত মঙ্গলবার একই জেলায় আরও তিন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হন। ১২ এপ্রিল চট্টগ্রামে ট্রাফিক পুলিশের এক সদস্য আক্রান্ত হওয়ায় আরও ২২৫ জনকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়। ডিএমপির এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
চার ব্যাংক কর্মী আক্রান্ত, মৃত্যু একজনের : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ এপ্রিল মার্কেন্টাইল ব্যাংকের দারুসসালাম শাখার এক কর্মকর্তা এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক সেনানিবাস শাখার এক কর্মকর্তার শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। একই দিন নারায়ণগঞ্জে কমার্স ব্যাংকের এক নিরাপত্তা কর্মী আক্রান্ত হন। ১০ এপ্রিল চট্টগ্রামে ব্যাংক এশিয়ার এক কর্মকর্তার শরীরে সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এর আগে ৬ এপ্রিল করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বরিশাল তালতলি শাখার এক সিনিয়র অফিসারের মৃত্যু হয়।
স্বাস্থ্য কর্মীদের অধিকার : করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্য কর্মীদের ১৬টি অধিকারের কথা জানিয়েছে, যা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রতিটি রাষ্ট্রের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, স্বাস্থ্যকর্মীরা ঝুঁকিতে থাকলে সবাই ঝুঁকিতে থাকবে। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত হলে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। গত ১৯ মার্চ প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকায় বলা হয়, স্বাস্থ্যকর্মীদের সঠিক তথ্য জানাতে হবে এবং পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সন্দেহভাজন ও শনাক্ত করোনা রোগীর সেবায় নিয়োজিত স্বাস্থ্য কর্মীদের পর্যাপ্ত পরিমাণ সুরক্ষাসামগ্রী দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে গাউন, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, গ্লাভস, গগলস, সাবান, পানি ও পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী।
ওই নির্দেশিকায় আরও বলা হয়, দোষারোপহীন পরিবেশে তাদের কাজের সুযোগ দিতে হবে। প্রতিদিন কাজের মধ্যে ছুটিসহ যথাযথ কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএমএর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, এসব শর্তের একটিও সঠিকভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে মনে হয় না। কারণ স্বাস্থ্যকর্মীরা এখনও পিপিই নিয়ে অভিযোগ করে আসছেন। এই পিপিই মানসম্পন্ন নয়। করোনা হাসপাতালে নিয়োজিত চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা খাবার পর্যন্ত পাচ্ছেন না। সেখানে পানি থাকছে না। তাহলে কোন শর্তটি পূরণ হলো? অব্যবস্থাপকদের হাতে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পড়লে যেমন হওয়ার কথা তেমনটিই হচ্ছে। দ্রুততম সময়ে এসব সমস্যার সমাধান করা হোক। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, গতকাল পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ পিপিই সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে প্রায় ৯ লাখ বিতরণ করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার চিকিৎসক ও এক হাজার ২০০ জনের বেশি নার্স প্রশিক্ষণের আওতায় এসেছেন। ইতোমধ্যে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য রাজধানীর ফাইভ স্টার, থ্রি স্টার মানের হোটেল বরাদ্দ করা হয়েছে। তাদের মনোবল বৃদ্ধি ও মানসিক স্বাস্থ্য অটুট রাখতে কাউন্সেলিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
