কোনো খরচ ছাড়াই ঘরে উঠল ধান
শেরপুরের মধ্য নকলায় ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে সমকাল সুহৃদ সমাবেশ ও কমিউনিটি পুলিশ ফোরামসহ একাধিক সংগঠনের সদস্যরা- সমকাল
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২০ | ১৪:৪০
'আমাগো জন্য এর চেয়ে বড় উপকার আর কী হতে পারে। চাইর আনা খরচ ছাড়াই খেতের ধান ঘরে উঠল। বড় উপকার অইল। ৪০-৫০ জন মিলা আমার খেতের ধান কাটল। কত মানুষ আবার এইড্যা দেখতে আইল। কত শিক্ষিত ছেলেরা ধান কাটছে- দেইখা চোখের পানি ধইরা রাখতে পারি নাই।'
শেরপুরের মধ্য নকলার ৬৫ বছর বয়সী কৃষক রহিম উদ্দিন গতকাল বৃহস্পতিবার সমকালের কাছে এভাবেই তার অনুভূতি প্রকাশ করলেন। ১৫০ শতাংশ জমিতে বোরোর আবাদ করেছিলেন তিনি। গতকাল সমকাল সুহৃদ সমাবেশ, স্টুডেন্ট কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম, করোনা ইমার্জেন্সি টিমসহ একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শেরপুরের অন্তত তিনটি জায়গায় কৃষকদের ধান কেটে মাড়াইও করে দিয়েছেন। এসব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে সহযোগিতা করছে জেলা পুলিশ।
কৃষক রহিম উদ্দিন সমকালকে জানান, চার ছেলে, দুই মেয়ে নিয়ে তার সংসার। কৃষিকাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। ধান পেকে যাওয়ায় তা কাটা নিয়ে এবার দুশ্চিন্তায় ছিলেন। মনে মনে ভেবে রাখেন, মেয়ের জামাই আশরাফ আলীকে নিয়ে অল্প অল্প করে নিজেই ধান কাটা শুরু করবেন। তবে হঠাৎ স্থানীয় প্রশাসন থেকে তাকে জানানো হয়, তার খেতের সব ধান কাটার ব্যবস্থা করা হবে। কথাটা প্রথমে তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। পরে সত্যি সত্যি বৃহস্পতিবার তার খেতে অনেক লোকজন এসে ধান কাটতে লেগে যায়। এক টাকাও খরচ লাগেনি। রহিম উদ্দিন আরও বলেন, প্রতিবছর একেক জন শ্রমিককে দিনে ৫০০-৭০০ টাকা পর্যন্ত দেওয়া লাগত। এবার ধান কাটা বাবদ তার একটা টাকাও খরচ না হওয়ায় পরিবারের সবাই খুব খুশি। এ ছাড়া গতকাল মধ্য নকলার বারমাইস্যা এলাকার আবু রায়হানের জমির বোরো ধান কেটে দিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। আবু রায়হান জানান, তার ৬৫ শতাংশ জমির ধান কেটে মাড়াই করে দেওয়া হয়েছে। যারা ধান কেটে দিয়েছেন, তাদের কাছে তিনি ঋণী। বিপদে এভাবে একজন আরেকজনের পাশে দাঁড়াচ্ছে দেখে এলাকার তরুণরাও উজ্জীবিত।
করোনাভাইরাসের প্রভাবে এবার বোরো মৌসুমে ধান কাটা নিয়ে কৃষক যাতে অনিশ্চয়তার মধ্যে না পড়েন, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে। এরপর হাওর অঞ্চলে ধান কাটার শ্রমিক পাঠানো শুরু হয় একাধিক জেলা থেকে। উত্তরবঙ্গ থেকে শ্রমিকরা আসতে থাকেন বিশেষ ব্যবস্থাপনায়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ধান কাটাসহ সব ধরনের কৃষি কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোসহ নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। কৃষি শ্রমিকদের ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করে একাধিক জেলায় সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। করোনা নিয়ে যাতে কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি না হয় সে লক্ষ্যে দেশব্যাপী বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং কোথাও কোথাও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা মাঠে নেমেছেন।
শেরপুরের পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম জানান, জেলায় ৮৯ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। কৃষকদের মধ্যে ধানা কাটা নিয়ে যাতে কোনো অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে জণগণের স্বাভাবিক জীবন-যাপনের নিশ্চয়তা থাকে।
শেরপুর জেলা সমকাল সুহৃদ সমাবেশের সাধারণ সম্পাদক ও করোনা ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিমের সমন্বয়ক শাহ ইমতিয়াজ চৌধুরী সমকালকে জানান, জেলায় সুহৃদ সমাবেশের অন্তত ৬০ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া জেলার সব ইউনিয়নে স্টুডেন্ট কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সদস্য তৈরি করা হয়েছে। তারা ত্রাণ বিতরণ থেকে শুরু থেকে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ করে দিচ্ছেন। এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
- বিষয় :
- করোনাভাইরাস
- ধান
- সুহৃদ সমাবেশ
