ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু

ঢাকার পরেই নারায়ণগঞ্জ

ঢাকার পরেই নারায়ণগঞ্জ
×

রাজবংশী রায়

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২০ | ১৪:৪০

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে দেশের আনাচে-কানাচে। প্রতিদিনই এ তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন জেলা ও এলাকা। বর্তমানে ৫৮ জেলায় করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন করে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও মাগুরায় করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারাদেশে ৪ হাজার ১৮৬ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে এ পর্যন্ত ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণে দেখা গেছে, আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাবে শীর্ষে অবস্থান করছে রাজধানী ঢাকা। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট আক্রান্তের ৪৫ দশমিক ৫১ শতাংশই রাজধানীর বাসিন্দা। আক্রান্তের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থান নারায়ণগঞ্জের, ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ। করোনা আক্রান্ত হয়ে ১৯ জেলায় মৃত ১২৭ জনের মধ্যে ৭৩ জনই ঢাকার বাসিন্দা। ঢাকার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু  নারায়ণগঞ্জে ৩০ জনের। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ জনগোষ্ঠী। এই হার ২৪ শতাংশ। আর মৃত্যু সবচেয়ে বেশি হয়েছে ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের। এই হার ১৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে নারী-পুরুষের হিসাবে পুরুষ ৬৮ শতাংশ এবং নারী ৩২ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন, আইইডিসিআর এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্নেষণ করে এ পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, করোনার সংক্রমণ ৫৮ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র কয়েকটি জেলা এখনও সংক্রমিত হয়নি। শুরুতে যখন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছিল, তখনই কিন্তু সরকার এই দুটি এলাকাকে লকডাউন করে কারফিউ জারি করতে পারত। একইসঙ্গে আক্রান্ত ওই ব্যক্তিকে আইসোলেশনে নিয়ে তার কন্টাক্ট ট্রেসিং করে অন্যদের কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া গেলে করোনা সারাদেশে এভাবে বিস্তার লাভের সুযোগ পেত না। নানা অব্যবস্থাপনার কারণে এখন দেশব্যাপী মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের দূরদর্শিতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে শুরু থেকেই করোনা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নিয়ে একটি অব্যবস্থাপনা চলছিল উল্লেখ করে ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, বিদেশফেরত ব্যক্তিদের কেবল স্ট্ক্রিনিং করে বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে দেওয়া হলো। এটি ছিল একটি চরম ভুল সিদ্ধান্ত। চীনের উহান থেকে ফিরিয়ে আনা ব্যক্তিদের মতো অন্য বিদেশফেরতদেরও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটি না করে তাদের গণহারে ছেড়ে দিয়ে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। অধিকাংশই তা না মেনে ঘোরাঘুরি করে সংক্রমণ ছড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখনও তো বাস্তবমুখী কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে করোনা প্রতিরোধ সত্যিই কঠিন হয়ে পড়বে।

১৯ জেলায় মৃত্যুর শীর্ষে ঢাকা, দ্বিতীয় নারায়ণগঞ্জ : করোনা সংক্রমিত হয়ে মৃত ১২৭ জনের হিসাব সংরক্ষণ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম। এর মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে ঢাকায় ৭৩ জন। ঢাকায় মৃত্যুর হার ৫৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে নারায়ণগঞ্জে ৩০ জন। এ জেলায় মৃত্যুর হার ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। এরপর মুন্সীগঞ্জ ৩ জন, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মৌলভীবাজারে ২ জন করে এবং কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, নরসিংদী, শরীয়তপুর, টাঙ্গাইল, জামালপুর, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও সিলেটে ১ জন করে মৃত্যুবরণ করেছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক সমকালকে বলেন, করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য আমরা যে সময়টি পেয়েছিলাম স্বাস্থ্য বিভাগ তা কাজে লাগাতে পারেনি। সুযোগটি কাজে লাগাতে পারলে ভিয়েতনাম, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলংকার মতো আমাদের দেশেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কম থাকত। আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন ও লকডাউন- এই তিনটির একটিও যথাযথভাবে করা হয়নি। এখনও হচ্ছে না। সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু লকডাউন করা হয়নি। ছুটি পেয়ে মানুষ গ্রামে চলে গেল। এর মধ্য দিয়ে সারাদেশে রোগটি বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আইসোলেশন হলো আক্রান্ত ব্যক্তিকে পৃথক করে রাখা। আর কোয়ারেন্টাইন হলো আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে ছিলেন কিন্তু আক্রান্ত নন- তাকে একটি স্থানে ১৪ দিন পৃথকভাবে রেখে পর্যবেক্ষণ করা। এগুলো তো কিছুই সঠিকভাবে করা হয়নি।

স্থানীয় প্রশাসনের করা লকডাউনের সমালোচনা করে এই জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, লকডাউনের উদ্দেশ্য হলো- সময় গণনা করা। অর্থাৎ লকডাউন করে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা। সারাদেশের মানুষ ঘরে আটকে থাকলে পরিস্থিতি কী ঘটে এবং তার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া। আমাদের তো লকডাউনই হয়নি। স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন লকডাউন ঘোষণা করছে। আর সারাদেশের মানুষ ইচ্ছেমতো ঘোরাঘুরি করছে। হাজার হাজার মানুষ দেখলাম জানাজায় অংশ নিল। তাহলে লকডাউনটা হলো কোথায়? এ অবস্থা চলতে থাকলে সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

মৃত্যুর শীর্ষে বয়স্করা, আক্রান্তে তরুণরা : তথ্যউপাত্ত বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, দেশে করোনা আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুবরণ করেছেন ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সীরা। আর সর্বোচ্চ আক্রান্ত হয়েছেন ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের হাতে থাকা মৃত ৭৪ জনের তথ্য বিচার করে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে- যাদের বয়স ৬০-৭০ বছর। এই হার ২৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এরপর ৫০-৬০ বছর বয়সী ১৩ জন। এই হার ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ৪০-৫০ বছর বয়সী ১১ জন। এই হার ১৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ৭০-৮০ বছর বয়সী এবং ২১-৩০ বছর বয়সী ৩ জন করে মৃত্যুবরণ করেছেন। এই হার ৪ দশমিক ০৫ শতাংশ। ৩০-৪০ বছর বয়সী এবং ১০ বছরের নিচে ২ জন করে মৃত্যুবরণ করেছেন। এই হার ২ দশমিক ৭০ শতাংশ।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার সমকালকে বলেন, আক্রান্ত ও মৃত ব্যক্তিদের তথ্যউপাত্ত যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, ৫০-৭০ বছর বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি।

মৃত ব্যক্তিদের কতজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। জানতে চাইলে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর সমকালকে বলেন, মৃতদের অধিকাংশই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অল্প কয়েকজন বাড়িতে ছিলেন। আবার কয়েকজনের ক্ষেত্রে মৃত্যুর পর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে। এখনও সব তথ্য পর্যালোচনা শেষ হয়নি। দ্রুততম সময়ে তা সম্পন্ন করে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।

করোনা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত বুলেটিনের তথ্য বিশ্নেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন দেশের তরুণরা। ২১-৩০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে সংক্রমণের হার ২৪ শতাংশ। এরপরই রয়েছেন ৩১-৪০ বছর বয়সী যুবকরা। এই হার ২২ শতাংশ। আক্রান্তদের ১৮ শতাংশের বয়স ৪১-৫০ বছরের মধ্যে, ১৫ শতাংশের বয়স ৫১-৬০ বছরের মধ্যে, ১০ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের বেশি, ৮ শতাংশের বয়স ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এবং ৩ শতাংশের বয়স ১০ বছরের নিচে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা সমকালকে বলেন, করোনা সংক্রমণের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যতগুলো পরামর্শ দিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো- ঘরে থাকা, দূরত্ব মেনে চলা। কিন্তু তরুণরা এই নির্দেশনা না মেনে ঘরে-বাইরে বের হচ্ছেন। রাস্তাঘাটেও তাদের বেশি ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। এ কারণে তাদের মধ্যে সংক্রমণের হারও বেশি। করোনা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করতে হলে সবাইকে অবশ্যই ঘরে থাকতে হবে।

আরও পড়ুন

×