বাবা চকলেট নিয়ে ফিরবে, অপেক্ষায় ছিল ছোট্ট আবদুল্লাহ
ছোট্ট আবদুল্লাহকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২০ | ০৭:৩০ | আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২০ | ০৭:৩৭
বাবার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি ছোট্ট আবদুল্লাহর। মাঝেমধ্যেই তিনি ফোনে বলতেন, শিগগিরই বাড়িতে ফিরবেন। সঙ্গে নিয়ে যাবেন সন্তানের প্রিয় চকলেট আর কেক।
বুধবার বিকেলে তাই বাড়িতে পুলিশ কর্মকর্তাদের আনাগোণা দেখে চঞ্চল হয়ে ওঠে পাঁচ বছরের আবদুল্লাহ। বাবা বুঝি চলে এসেছেন! আগ্রহের আতিশয্যে সে জিজ্ঞেস করেই বসে, ‘আব্বু কি চলে আসছে? চকলেট আনছে?’ তার প্রশ্ন শুনে মা, বোন, দাদী উচ্চস্বরে কাঁদতে শুরু করেন। অশ্রু বাঁধ মানেনি উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদেরও। কারণ শিশুটির বাবা পুলিশ কনস্টেবল জসিম উদ্দিন তখন বাড়ির সামনে ছিলেন ঠিকই, তবে তার এবারের ফেরাটা অন্যরকম। প্রতিবারের মতো তিনি ছুটে গিয়ে সন্তানকে কোলে নেননি, বরং চুপচাপ শুয়েছিলেন লাশবাহী গাড়িতে।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মঙ্গলবার রাজধানীতে মৃত্যুবরণ করেন ওয়ারী পুলিশ ফাঁড়িতে কর্তব্যরত কনস্টেবল জসিম উদ্দিন। করোনার লক্ষণ থাকায় গত ২৫ এপ্রিল তার নমুনা পাঠানো হয় আইইডিসিআরে। একইসঙ্গে তাকে ফকিরাপুলের একটি আবাসিক হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। সেখানে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মঙ্গলবার রাত ১০ টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, করোনাযুদ্ধে শহীদ প্রথম পুলিশ সদস্য জসিম উদ্দিনের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচংয়ে। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে বিশেষ বিধি মেনে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে লাশ নিয়ে যাওয়ার পর তার বাড়িতে এক হৃদয় বিদারক পরিস্থিতির অবতারণা হয়। একদিকে জসিমের পরিবারের সদস্যরা কাঁদছেন, অন্যদিকে তার অবুঝ সন্তান আবদুল্লাহ বাবা বাড়ি ফিরেছেন ভেবে আনন্দে উদ্বেলিত। ছোট্ট শিশুটিকে আমরা বলতেও পারছিলাম না, আর কোনোদিন ফিরবে না তার প্রাণপ্রিয় বাবা। তার আবদার মেটাতে নিয়ে আসবে না চকলেট।
পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, জসিম উদ্দিনের তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবার ছোট আবদুল্লাহ। বড় মেয়ের বয়স ১৪ ও মেঝ মেয়ের বয়স ৯ বছর। তারা ছোট ভাইকে বুকে জড়িয়ে কাঁদছিল। জসিমের স্ত্রী ও মা প্রিয়জনের এই অকালমৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। এর মধ্যেই দ্রুত লাশ দাফনের ব্যবস্থা করতে হয়। জানাজার নামাজে মোট ১২ জন উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় থানার ওসিসহ পাঁচজন পুলিশ সদস্য, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দু’জন প্রতিনিধি, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও মৃতের চার স্বজন।
পুলিশ সুপার জানান, জসিমের তিন ভাই গ্রিস ও এক ভাই ইতালিতে থাকেন। তাদের বাবা বেঁচে নেই। গ্রামের বাড়িতে জসিমের স্ত্রী, সন্তান ও মা থাকেন। পরিবারটি মোটামুটি সচ্ছল। তারপরও পুলিশের পক্ষ থেকে ৫০ কেজি চালসহ ডাল-তেল-লবণের মতো নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ছোট্ট আবদুল্লাহর জন্য দেওয়া হয়েছে আপেল, কমলা, খেজুর, চিপস্ ও বিস্কুট। এছাড়া তার জন্য ভালো চকলেট ও কেক দেওয়া হবে। স্বজনহারা পরিবারটির পাশে সবসময় থাকবে বাংলাদেশ পুলিশ।
কুমিল্লা সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানভীর সালেহীন ইমন ফেসবুকে জসিমের ছেলেকে নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, প্রিয় আবদুল্লাহ, বাবা, আমরা তোমার চোখে তাকিয়ে তখন বলতে পারিনি জীবনের নির্মম সত্যটি! একদিন বড় হয়ে জানতে পারবে তোমার পুলিশ বাবা মহামারী করোনায় সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে লড়াই করেছেন দেশমাতৃকার তরে। মানুষ ও মানবতার তরে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় উৎসর্গ করেছেন জীবন। সেদিন এই লাল সবুজের বুকে তুমি মাথা উঁচু করে গর্বে উদ্ভাসিত হবে। ইউনিফর্ম পরিহিত লাখো লাখো পুলিশ চাচ্চুদের মুখাবয়বে ভেসে উঠবে তোমার বাবার মুখ!
তিনি আরও বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ যোদ্ধা বাংলাদেশ পুলিশের বীর সদস্যরা প্রাকৃতিক কিংবা মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে কখনই দেশপ্রেমের পরীক্ষায় পিছপা হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। সেবার সুমহান ব্রত নিয়ে আমরা সবসময়ই আছি আপনাদের পাশে জনগণের পুলিশ হয়ে।
কনস্টেবল জসিম উদ্দিনের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আরও দুই সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ডিএমপির পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) দক্ষিণ বিভাগে কর্মরত এএসআই আবদুল খালেক বৃহস্পতিবার ভোরে এবং ট্রাফিক উত্তর বিভাগের কনস্টেবল আশেক মাহমুদ বুধবার রাতে মৃত্যুবরণ করেন।