কুসংস্কার মোকাবিলাও বড় চ্যালেঞ্জ
অবশেষে স্বস্তি ফিরল মনপুরায়
মনপুরায় করোনা আক্রান্ত কিশোর নূর আলমকে ফল সরবরাহ করেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা -সমকাল
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ মে ২০২০ | ১৪:৩১
বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা ভোলা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরের বুকে এক নয়নাভিরাম দ্বীপ মনপুরা। লক্ষাধিক লোকের বসবাস এই দ্বীপে। নূর আলম নামে ১৯ বছরের এক কিশোরকে ঘিরে এই দ্বীপের বাসিন্দাদের মধ্যে করোনা আতঙ্ক তৈরি হয়। এখন ওই কিশোরই আবার দ্বীপবাসীর মনে স্বস্তি নিয়ে এসেছেন।
ঢাকা থেকে ফেরার পর নমুনা পরীক্ষা শেষে ধরা পড়ে নূর আলম করোনায় আক্রান্ত। এর আগে দ্বীপের অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাস ছিল, এত নদী-জল পেরিয়ে করোনা মনপুরা পর্যন্ত আসতে পারবে না। করোনা নিয়ে সেখানকার মানুষের মধ্যে ছিল অদ্ভুত সব গোঁড়ামি ও কুসংস্কার। করোনাভাইরাসের পাশাপাশি এই কুসংস্কারের চ্যালেঞ্জও স্থানীয় প্রশাসনকে মোকাবিলা করতে হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে নূর আলম সমকালকে জানান, এপ্রিলের শেষ দিকে ঢাকার সোয়ারিঘাট থেকে প্রথমে ট্রলারে নোয়াখালী যান তিনি। সেখান থেকে আবার ট্রলারে করে মনপুরার মাস্টারহাট এলাকায় নিজেদের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছান। বাড়িতে যাওয়ার পরপরই তার থানা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে তার নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ২৩ এপ্রিল জানতে পারেন তিনি করোনায় আক্রান্ত।
ওই সময়ে বর্ণনা দিতে গিয়ে নূর আলম জানান, করোনায় আক্রান্তের খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের পরিবেশ বদলে যেতে থাকে। তার বাড়ি লকডাউন করা হয়। মনপুরায় হাজিরহাট ডিগ্রি কলেজে আইসোলশনে রেখে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। নিয়মিত তার জন্য ফল পাঠানো হতো। একজন চৌকিদার এসে খাবার দিয়ে যেতেন। এভাবে দুই সপ্তাহ তাকে কাটাতে হয়। দু'দিন আগে জানা গেছে তার করোনা নেগেটিভ। এরপর তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। ওই ছাড়পত্র নিয়ে এখন বাড়িতে আছেন তিনি।
নূর আলম জানান, ঢাকায় অনলাইনে খাবার সরবরাহের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন তিনি। করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন- এটা শোনার পর তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। কারণ করোনার কোনো উপসর্গ তার দেখা দেয়নি। ছাড়পত্র পাওয়ার পরও চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী এখনও বাড়ির বাইরে পা দেননি। বাড়ির খুব কাছে মেঘনা নদী। মেঘনার পাড়ে গিয়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার অপেক্ষায় আছেন তিনি।
মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মাহমুদুর রশিদ সমকালকে জানান, নূর আলম সংক্রমিত হওয়ার আগে মনপুরার কাউকে বিশ্বাস করানোই কঠিন ছিল এখানেও করোনা আসতে পারে। আর করোনা নিয়ে এখানে নানা কুসংস্কার রয়েছে। যেমন প্রথমে কেউ কেউ থানকুনি পাতা খাওয়া শুরু করল। এমনও দেখা গেছে ঢাকা থেকে কেউ এসেছেন কিন্তু করোনা টেস্টের জন্য তার নমুনা সংগ্রহ করা যাচ্ছিল না। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল- নমুনা দিলেই তাকে সমাজ থেকে একঘরে করে দেওয়া হবে। সরকার যখন মসজিদে যাওয়া ও নামাজ পড়ার সময় কিছু স্বাস্থ্যবিধি মানার পরামর্শ দিয়েছিল, তখনও এখানে অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এটা পালনের প্রবণতা ছিল না। উল্টো তারা গোঁড়ামির পরিচয় দিচ্ছিল। সুশিক্ষা ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তার ছাপ মনপুরার অনেককেই স্পর্শ করেনি। লক্ষণবিহীন অবস্থায় যে করোনা আক্রান্ত হতে পারেন- এটাও বিশ্বাস করানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
থানার এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, নূর আলম করোনায় শনাক্ত হওয়ার পর লোকে বিশ্বাস করতে শুরু করে কোনো না কোনোভাবে করোনা এই দ্বীপেও আসতে পারে। আবার সে করোনা থেকে মুক্ত হওয়ার পর তারা ভাবতে শুরু করেছে, এটা অন্য রোগের মতোই। বিশেষায়িত করোনা হাসপাতালে না নিয়েও আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে ভালো করা যায়। এখন কেউ এলাকার বাইরে থেকে এলে নিজেরাই প্রশাসনের লোকজনকে খবর দিচ্ছে। বাইরে থেকে আসা ব্যক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোয়ারেন্টাইনে রাখতে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে প্রশাসনকে চাপও দেওয়া হয়েছে। নূর আলমের করোনা শনাক্ত হওয়ার পর থেকে সচেতনতার এমন একটা পর্যায় এখানে তৈরি হয়েছে।
মনপুরার স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত ওই দ্বীপের ২১ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে কেবল নূর আলমের রিপোর্টই পজিটিভ এসেছে। বাকিদের করোনা ধরা পড়েনি। প্রায় বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপ থেকে করোনার নমুনা সংগ্রহ করা আর তা পরীক্ষার জন্য বরিশাল পর্যন্ত পাঠানোই বিশাল চ্যালেঞ্জ। নমুনা সংগ্রহের পর মেঘনা পাড়ি দিয়ে নৌ অ্যাম্বুলেন্সে প্রথমে তা নেওয়া হয় তজুমুদ্দিনে। সেখান থেকে নমুনা যায় ভোলায়। এরপর ভোলা থেকে পাঠানো হয় বরিশালে। দুপুর ২টার মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ করতে না পারলে ওই দিনের নমুনা বরিশাল পর্যন্ত পাঠানো সম্ভব হয় না।
ডা. মাহমুদুর রশিদ জানান, পাঁচ চিকিৎসক, ১৩ নার্সসহ মনপুরার স্বাস্থ্য বিভাগে ৪৬ জন স্টাফ ও ১৮ মাঠকর্মী রয়েছেন। স্থানীয় ডেন্টাল সার্জন সাব্বির আহমেদকে নিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে আসছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা। মাইক হাতে এলাকায় ঘুরে ঘুরে মানুষকে সচেতন করে আসছেন তারা। বিভ্রান্তি ও কুসংস্কার দূর করতে মানুষকে প্রকৃত তথ্য জানানোর চেষ্টা করছেন।