ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

‘এহন দুইডা মাইয়ারে কেমনে মানুষ করমু’

‘এহন দুইডা মাইয়ারে কেমনে মানুষ করমু’
×

আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হামলায় নিহত শরিফুলের স্ত্রী বিউটি বানুর আহাজারি। ছবি: সমকাল

কামাল উদ্দিন, কুমিল্লা 

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০১:৫৯ | আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০২:৩০

‘খেলা নিয়া ওরা মানুষটারে এইভাবে সবার সামনে মাইরা ফালাইবো, এইটা কেমন কথা? কেউ রক্ষা করলো না। তাইন (তিনি) তো কিচ্ছুই রাইখা যাননি। কেমন চলবে মোর সংসার। আমার দুইডা মাইয়া ছাওয়াল। এহন কারে বাবা কইয়া ডাকবো? আমার দুইডা মাইয়া এতিম হইয়া গেল। এহন দুইডা মাইয়ারে কেমনে মানুষ করমু। যারা আমার স্বামীরে খুন করছে, মুই তাদের কঠিন বিচার চাই। হামার গোটা পরিবারডাই শেষ হইয়া গেল।’

কুমিল্লায় আর্জেন্টিনা ও মিশরের মধ্যে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার সময় আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হামলায় নিহত শরিফুলের স্ত্রী বিউটি বানু আহাজারি করে এসব কথা বলেন। স্বামী হারিয়ে এভাবেই বুকফাটা কান্না করে ঘাতকদের বিচার চাইলেন বিউটি বানু।

বুধবার রাত ১১টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। পরিবার মামলাও দেয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে। 

এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে নীলফামারী থেকে কুমিল্লায় ছুটে এসেছেন শরিফুলের শ্বশুর মতিউর রহমান, শাশুড়ি নুর বানু, ভাই সাইফুল ইসলামসহ স্বজনেরা। বুধবার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শরিফুলের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বিকেলে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করার পর স্বজনরা মরদেহ নিয়ে গ্রামের বড়িতে গেছেন। 

স্বজনরা জানান, কাজের খোঁজে প্রায় আট মাস আগে কুমিল্লায় আসেন সঙ্গে নিয়ে আসেন স্ত্রী বিউটি বানু ও দুই কন্যাসন্তান। কুমিল্লা নগরীর ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের মঠপুষ্করনী এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাতেন তিনি। প্রতিদিন মালিকের জমা শেষে যা থাকত, তা দিয়েই কোনোমতে চলত সংসার।

শরিফুলের শ্বশুর মতিউর রহমান বলেন, হাজার মাইল দূরে খেলা হচ্ছে, এ খেলা নিয়ে সবার সামনে শরিফুলকে ওরা মেরে ফেললো। কেউ বাঁচালো না। তার দুই মেয়ে নীলফামারীতে থাকা অবস্থায় পড়াশোনা করত। বড় মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি আর ছোট মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শরিফুল চেয়েছিলেন মেয়েদের কুমিল্লায় স্কুলে ভর্তি করতে। কিন্তু তার সেই আশা আর পূরণ হলো না। আমার মেয়েটা এখন দুইটা কন্যাসন্তান নিয়ে কীভাবে বাঁচবে? 

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এখানে কেউ নেই। এখন মামলা না করতে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। টাকা দিবে বলতেছে। মরদেহ দাফন করতে বাড়িতে যাচ্ছি। আমরা ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার চাই।’

এর আগে. মঙ্গলবার রাতে সদর উপজেলার ধনপুর এলাকার মহসিন মিয়ার দোকানে একদল দর্শক আর্জেন্টিনা ও মিশরের মধ্যকার ফুটবল ম্যাচটি দেখছিলেন। সেখানে অটোরিকশাচালক শরিফুলও ছিলেন। 

প্রত্যক্ষদর্শী অটো চালক আবদুর রহিম বলেন, মেসি প্যানাল্টিতে গোল করতে না পারায় শরীফুল আর্জেটিনার সমর্থকদের বলেন, ‘দেখো তোমাদের বাবা (মেসি) তো গোল করতে পারলো না।’

এ সময় আর্জেন্টিনা সমর্থক হিসেবে পরিচিত স্থানীয় বাবু ও মাইন উদ্দিন মালুসহ তাদের সহযোগীরা ক্ষুব্ধ হয়ে শরিফুল ইসলামের ওপর হামলা করে। পরে তাকে দোকানের অদূরে তুলে নিয়ে আরেক দফায় মারধর করা হয়। এ সময় স্থানীয়রা গুরুতর আহত শরিফুলকে উদ্ধার করে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। টিভি দেখার সেই ঘটনাস্থলের চা দোকানটিও বুধবার বন্ধ দেখা গেছে। 

বুধবার রাত ১১টায় কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার সমকালকে বলেন, এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। পরিবারের সদস্যরা মরদেহ দাফন করতে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। ওসির ভাষ্য, নিহত ব্যক্তি কোনো ফুটবল টিমের সমর্থক ছিলেন এটা এখন দেখার বিষয় নয়। তাকে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

আরও পড়ুন

×