ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

গবেষণার তথ্য

করোনা উপসর্গে মৃতদের বড় অংশই চিকিৎসা পাননি

করোনা উপসর্গে মৃতদের বড় অংশই চিকিৎসা পাননি
×

ইন্দ্রজিৎ সরকার

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ মে ২০২০ | ১৪:৩২

'দেশে করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশেরই চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা হয়নি। ৮ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৮৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৫৬ জন বাসায় অথবা কর্মস্থলে মারা গেছেন। তাদের ৬৪.৭৪ ভাগই একরকম বিনাচিকিৎসা বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করার আগেই মারা গেছেন। উপসর্গে মৃতদের মধ্যে ১৪.১০ ভাগ স্থানীয় চিকিৎসক, পল্লিচিকিৎসক, হোমিওপ্যাথিক, কবিরাজ এমনকি তান্ত্রিকের কাছে যান। ১২.৮২ ভাগ উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যান এবং সেখান থেকে চিকিৎসা-পরামর্শ দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার পর তাদের মৃত্যু হয়। ৭.০৫ ভাগ হোম বা প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে মৃত্যুবরণ করেন। আর ১.২৮ ভাগ একাধিক হাসপাতালে গেছেন, তবে করোনা আতঙ্কে তাদের চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করা হয়েছে। ৩.৯০ ভাগ রাস্তার ধারে, মসজিদে, বাজারে, উপকূলে, চা বাগানে, বাসার সামনে বা হাসপাতালের বাইরে মরে পড়ে ছিলেন।'

'কভিড-১৯ উপসর্গে মৃত্যুসমূহ ও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা' শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। দেশ ও দেশের বাইরের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, গবেষক, ফ্রিল্যান্সার ও কম্পিউটার ডেভেলপারদের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এ গবেষণা পরিচালিত হয়। মূলত বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত খবরের তথ্য ও তথ্যসূত্র পর্যালোচনা করে তাদের প্রতিবেদনটি তৈরি। গবেষক দলের পক্ষে নেদারল্যান্ডসের গ্রনিঙ্গেন ইউনিভার্সিটির এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের শিক্ষার্থী অনুপম সৈকত শান্ত জানান, আইইডিসিআর বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রতিদিন কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর যে তথ্য জানায়, সেখানে করোনা উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যাটি অনুল্লেখিত থেকে যায়। এ কারণেই দেশজুড়ে করোনা উপসর্গে মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে সংকলিত করার উদ্দেশ্যে গবেষণা কার্যক্রমটি হাতে নেওয়া হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে নকিয়া বাংলাদেশ লিমিটেডের সাবেক এই টেলিকম প্রকৌশলী জানান, করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর পরও নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি বা করা যায়নি। তবে এপ্রিলের শুরু থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর পর নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এপ্রিল পর্যন্ত করোনা উপসর্গে মৃতদের ৭৭ ভাগ বা ২৯৮ জনের নমুনা ল্যাবে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ২৬৫ জনের নমুনা নেওয়া হয়েছে মৃত্যুর পর। মাত্র ৩৩ জনের নমুনা মৃত্যুর আগে সংগ্রহ করা হয়। তিনি জানান, করোনা উপসর্গে মার্চে ৭৩ ও এপ্রিলে ৩১৩ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ ২০ জনের মৃত্যু হয় ১১ এপ্রিল। এক দিনে ১৫ বা তার বেশিজনের মৃত্যু হয়েছে পাঁচ দিন এবং এপ্রিলের শেষ নাগাদ সংখ্যাটি ৫ থেকে ১০ এর মধ্যে স্থিতিশীল রয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা উপসর্গে মৃতদের ২৬৮ জনেরই জ্বর ছিল। ২৩৫ জনের ছিল শ্বাসকষ্ট, ১৩৮ জনের সর্দি ও ১৩৪ জনের কাশি। জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও সর্দি- এই চার লক্ষণের কমপক্ষে দুটি লক্ষণ ছিল ২৪৬ জনের, কমপক্ষে তিনটি লক্ষণ ছিল ১৪৯ জনের। উপসর্গে মৃতদের ৭১ ভাগ পুরুষ ও ২৯ ভাগ নারী (১১ জনের তথ্য পাওয়া যায়নি)। করোনায় আক্রান্তের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের হার যথাক্রমে ৩২ ও ৬৮ ভাগ।

এদিকে বাংলাদেশে করোনার উপসর্গে কিংবা কভিড-১৯ পজিটিভ হয়ে মৃতদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হচ্ছে শিশুমৃত্যু। মৃতদের ২ ভাগ ১০ বছরের কম বয়সী শিশু। করোনা উপসর্গে মৃতদের ক্ষেত্রে শিশু ৬ ভাগ। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ২০ শিশু করোনা উপসর্গে মারা গেছে। আর ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-তরুণ মারা গেছে আরও ২৪ জন বা ৭.৬ ভাগ। করোনা উপসর্গে মৃত্যুর ১৩২টি ঘটনায় পেশাগত তথ্য পাওয়া যায়নি। বাকি ২৫৪ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৭ জন শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ। করোনা উপসর্গে সর্বাধিক ২৫ জন মারা গেছেন নারায়ণগঞ্জে ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৮ জন ঢাকায়। করোনা উপসর্গ থাকা ৫০ জন হাসপাতালে নেওয়ার পথে অর্থাৎ চিকিৎসা শুরুর আগেই মারা যান। উপসর্গ নিয়ে ১৩৯ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে মাত্র ৭.৩৮ ভাগ দু'দিনের বেশি বেঁচেছেন এবং মাত্র ০.৮২ ভাগ রোগী আইসিইউতে ভর্তি অবস্থায় মারা গেছেন। রোগীদের ১৩.৯৩ ভাগই মারা গেছেন ভর্তি হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে।

প্রতিবেদনটির উপসংহারে বলা হয়েছে, এই মৃত্যুগুলোর কতটি করোনায় আর কতটি নয়, সে সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা ও ভঙ্গুর দশার চিত্রটি গবেষণায় পরিস্কারভাবেই উঠে এসেছে।

আরও পড়ুন

×