বাজেট ২০২০-২১
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতেই হবে
×
রাজবংশী রায়
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৩ জুন ২০২০ | ১৪:১৬
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ না করলে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বাস্তবচিত্র হয়তো অন্ধকারেই থেকে যেত। করোনাকালে চিকিৎসা না পেয়ে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে মানুষের নির্মম মৃত্যুর ঘটনা দৃশ্যমান হচ্ছে। বছরের পর বছর স্বাস্থ্য খাতে চলা দুর্নীতির ক্ষতচিহ্নকেও স্পষ্ট করে দিয়েছে। এ কথাও সত্য, বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বরাদ্দ দেওয়া হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেওয়া হয় স্বাস্থ্য খাতে। এমনকি বিশ্বের অনুন্নত বহু দেশের তুলনায়ও আমাদের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম থাকে। যতটুকু বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা নিয়েও হয় নয়ছয়।
গত এক দশকে সার্বিকভাবে দেশের অবকাঠামো খাতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। সড়ক-মহাসড়ক, ফ্লাইওভারের পাশাপাশি হাতিরঝিলের মতো নয়নাভিরাম স্থাপনা গড়ে উঠেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় বড় স্থাপনার কাজ চলমান। দেশের উন্নয়নে এসব স্থাপনার প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু মানুষের জীবন ও বেঁচে থাকার অবলম্বন স্বাস্থ্য খাত সমপরিমাণ গুরুত্ব পায়নি এতকাল। এ জন্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ মুহূর্ত থেকেই স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রগুলো বলছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে চার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হতে পারে। চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ আছে ২৫ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। আগামী বছর এটি বেড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।
করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই বরাদ্দ কাঙ্ক্ষিত নয় উল্লেখ করে স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, 'বছরের পর বছর স্বাস্থ্য খাতকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এ জন্য এখন মানুষ ভর্তির জন্য হাসপাতালে শয্যা পাচ্ছে না। আইসিইউ সংকটে মানুষ মারা যাচ্ছে।' স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৪ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুবা স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাবে না। বরাদ্দের পাশাপাশি এ খাতে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে, যাতে অনিয়ম-দুর্নীতি না হয়।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ছে, তবে অপ্রতুল :পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান গতকাল বুধবার সমকালকে বলেন, সরকার স্বাস্থ্য খাতকে সব সময় গুরুত্ব দেয়। অনেকে হয়তো বলবেন, টাকার অঙ্কে বাড়লেও জিডিপি কিংবা মোট বাজেটের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম দেওয়া হয়। সবাইকে মনে রাখতে হবে, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই একটি বাজেট করা হয়। প্রতিটি খাতকে বিবেচনায় নিতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্য খাত অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যই আগামী অর্থবছরে এই খাতে উন্নয়ন বাজেট চার হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব থাকছে।
এম এ মান্নান বলেন, চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন বাজেট ৯ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে আরও চার হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট-১ শাখার যুগ্ম সচিব সিরাজুন নুর চৌধুরী সমকালকে বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ চার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে সাত হাজার জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও পাঁচ হাজার জনবল নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই জনবলের বেতন-ভাতা খাতেও অনেক টাকা চলে যাবে- এ প্রসঙ্গ তুলে ধরে মাত্র চার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সিরাজুন নুর চৌধুরী বলেন, ওই জনবলের বেতন-ভাতা খাতে ৫০০ থেকে ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। বাকিটা উন্নয়ন খাতেই ব্যয় হবে। গত ১০ বছরে স্বাস্থ্য খাতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা পুরোপুরি কখনও ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। প্রত্যেক অর্থবছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা করে ব্যয় করা সম্ভব হয়নি।
এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক সমকালকে বলেন, বাজেটে বরাদ্দ, টাকা ছাড় করার বিষয়ে সরকারের নীতির পরিবর্তন করতে হবে। জুনে বাজেট দেওয়ার পর সারা বছরের প্রথম ভাগে টাকা ছাড় করা হয় না। বছরের শেষভাগে গিয়ে পুরো বরাদ্দ ছাড় করা হয়। মে মাসের শেষদিকে যখন অর্থ ছাড় করা হয়, তখন হাতে মাত্র এক মাসের মতো সময় থাকে। এই স্বল্প সময়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা সম্ভব হয় না। এ কারণে অর্থ ফেরত চলে যায়। সুতরাং পদ্ধতিগত পরিবর্তন না করলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না।
সিংহভাগ ব্যয়ই বেতন-ভাতায় :চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশেরও কম। মোট বরাদ্দের অর্ধেকের বেশি বেতন-ভাতা, ওষুধ কেনাসহ পরিচালন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে। উন্নয়নের জন্য অবশিষ্ট থাকা টাকার বড় অংশ ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো প্রকল্প খাতে ব্যয় হয়। স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য অত্যন্ত কম পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ থাকে। অন্যদিকে, পরিবহন ও যোগাযোগ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ এবং স্থানীয় সরকারের খাতগুলোতে অনুন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় উন্নয়ন ব্যয় বেশি।
চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ ২৫ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা অনুন্নয়ন খাতে। মোট স্বাস্থ্য বাজেটের এটা প্রায় ৫৩ শতাংশ। এর এক-চতুর্থাংশের মতো ওষুধ ও সরঞ্জামাদি কেনার জন্য বরাদ্দ। সিংহভাগই যাচ্ছে বেতন-ভাতা খাতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ সমকালকে বলেন, করোনার সংক্রমণ সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে, স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একক কোনো বিষয় নয়। অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সবাইকে এই খাতের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতে সর্বনিম্ন ব্যয়ের কাতারে বাংলাদেশ :বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হাতে থাকা তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু সরকারি ব্যয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। মাথাপিছু প্রায় দুই হাজার ডলার ব্যয় করে এই দেশটি দক্ষিণ এশিয়ায় সবার শীর্ষে রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে শ্রীলঙ্কা ৩৬৯ ডলার, ভারত ২৬৭ ডলার, পাকিস্তান ১২৯ ডলার ব্যয় করে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ সবচেয়ে কম ব্যয় করে। মাথাপিছু ব্যয় মাত্র ৮৮ ডলার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী দেশের মোট বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ হতে হবে স্বাস্থ্য বাজেট। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেট অনেক কম। জিডিপির এক শতাংশের নিচে। বিশ্বে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ ব্যয় করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সুইজারল্যান্ড ১২ দশমিক ২ শতাংশ এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা জার্মানি ১১ দশমিক ২ শতাংশ ব্যয় করে। জিডিপির তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম ব্যয় করে যথাক্রমে মোনাকো, পাপুয়া নিউগিনি ও ব্রুনাই। এই তিন দেশেরও পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এই দুই দেশের নাগরিকরা নিজেরাই স্বাস্থ্যসেবা খরচের ৭০ শতাংশের বেশি জোগায়।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতেই হবে :বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, প্রতিবছর বাজেটের সময় আমরা স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে আসছি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য জনবলের মানদণ্ড অনুযায়ী বিন্যাসের কথাও বলে আসছি; কিন্তু সরকার তা কখনোই আমলে নেয়নি। এবার করোনা পরিস্থিতি স্বাস্থ্য খাতের ভগ্নদশা আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে। এর পরও সরকার স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব না দিলে বুঝতে হবে, তারা মানুষের জীবন নিয়ে তামাশা করছে।
বিএমএ মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্য খাতকে বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এর সঙ্গে পুরো জাতির ভাগ্য জড়িত। বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে আমূল সংস্কার করতে হবে। কারণ বছরের পর বছর ধরে এই খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি দানা বেঁধেছে। সর্বত্রই শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই করোনা দুর্যোগেও কেনাকাটা নিয়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সিন্ডিকেটগুলো দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিম্নমানের পিপিই ও মাস্ক সরবরাহ করে ওই চক্রটি হাজার হাজার চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর জীবন হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য খাতকে জনবান্ধব করতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্য খাতের পুরো বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সরাসরি মনিটর করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সারাদেশে জেলা শহরে আইসিইউ চালুর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং স্বাস্থ্য খাতে কী পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন হবে, তা প্রধানমন্ত্রী ভালো করেই জানেন এবং সে অনুযায়ী করণীয় নির্ধারণ করবেন বলে জানান তিনি।
গত এক দশকে সার্বিকভাবে দেশের অবকাঠামো খাতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। সড়ক-মহাসড়ক, ফ্লাইওভারের পাশাপাশি হাতিরঝিলের মতো নয়নাভিরাম স্থাপনা গড়ে উঠেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় বড় স্থাপনার কাজ চলমান। দেশের উন্নয়নে এসব স্থাপনার প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু মানুষের জীবন ও বেঁচে থাকার অবলম্বন স্বাস্থ্য খাত সমপরিমাণ গুরুত্ব পায়নি এতকাল। এ জন্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ মুহূর্ত থেকেই স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রগুলো বলছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে চার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হতে পারে। চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ আছে ২৫ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। আগামী বছর এটি বেড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।
করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই বরাদ্দ কাঙ্ক্ষিত নয় উল্লেখ করে স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, 'বছরের পর বছর স্বাস্থ্য খাতকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এ জন্য এখন মানুষ ভর্তির জন্য হাসপাতালে শয্যা পাচ্ছে না। আইসিইউ সংকটে মানুষ মারা যাচ্ছে।' স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৪ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুবা স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাবে না। বরাদ্দের পাশাপাশি এ খাতে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে, যাতে অনিয়ম-দুর্নীতি না হয়।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ছে, তবে অপ্রতুল :পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান গতকাল বুধবার সমকালকে বলেন, সরকার স্বাস্থ্য খাতকে সব সময় গুরুত্ব দেয়। অনেকে হয়তো বলবেন, টাকার অঙ্কে বাড়লেও জিডিপি কিংবা মোট বাজেটের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম দেওয়া হয়। সবাইকে মনে রাখতে হবে, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই একটি বাজেট করা হয়। প্রতিটি খাতকে বিবেচনায় নিতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্য খাত অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যই আগামী অর্থবছরে এই খাতে উন্নয়ন বাজেট চার হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব থাকছে।
এম এ মান্নান বলেন, চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন বাজেট ৯ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে আরও চার হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট-১ শাখার যুগ্ম সচিব সিরাজুন নুর চৌধুরী সমকালকে বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ চার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে সাত হাজার জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও পাঁচ হাজার জনবল নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই জনবলের বেতন-ভাতা খাতেও অনেক টাকা চলে যাবে- এ প্রসঙ্গ তুলে ধরে মাত্র চার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সিরাজুন নুর চৌধুরী বলেন, ওই জনবলের বেতন-ভাতা খাতে ৫০০ থেকে ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। বাকিটা উন্নয়ন খাতেই ব্যয় হবে। গত ১০ বছরে স্বাস্থ্য খাতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা পুরোপুরি কখনও ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। প্রত্যেক অর্থবছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা করে ব্যয় করা সম্ভব হয়নি।
এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক সমকালকে বলেন, বাজেটে বরাদ্দ, টাকা ছাড় করার বিষয়ে সরকারের নীতির পরিবর্তন করতে হবে। জুনে বাজেট দেওয়ার পর সারা বছরের প্রথম ভাগে টাকা ছাড় করা হয় না। বছরের শেষভাগে গিয়ে পুরো বরাদ্দ ছাড় করা হয়। মে মাসের শেষদিকে যখন অর্থ ছাড় করা হয়, তখন হাতে মাত্র এক মাসের মতো সময় থাকে। এই স্বল্প সময়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা সম্ভব হয় না। এ কারণে অর্থ ফেরত চলে যায়। সুতরাং পদ্ধতিগত পরিবর্তন না করলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না।
সিংহভাগ ব্যয়ই বেতন-ভাতায় :চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশেরও কম। মোট বরাদ্দের অর্ধেকের বেশি বেতন-ভাতা, ওষুধ কেনাসহ পরিচালন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে। উন্নয়নের জন্য অবশিষ্ট থাকা টাকার বড় অংশ ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো প্রকল্প খাতে ব্যয় হয়। স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য অত্যন্ত কম পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ থাকে। অন্যদিকে, পরিবহন ও যোগাযোগ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ এবং স্থানীয় সরকারের খাতগুলোতে অনুন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় উন্নয়ন ব্যয় বেশি।
চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ ২৫ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা অনুন্নয়ন খাতে। মোট স্বাস্থ্য বাজেটের এটা প্রায় ৫৩ শতাংশ। এর এক-চতুর্থাংশের মতো ওষুধ ও সরঞ্জামাদি কেনার জন্য বরাদ্দ। সিংহভাগই যাচ্ছে বেতন-ভাতা খাতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ সমকালকে বলেন, করোনার সংক্রমণ সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে, স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একক কোনো বিষয় নয়। অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সবাইকে এই খাতের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতে সর্বনিম্ন ব্যয়ের কাতারে বাংলাদেশ :বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হাতে থাকা তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু সরকারি ব্যয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। মাথাপিছু প্রায় দুই হাজার ডলার ব্যয় করে এই দেশটি দক্ষিণ এশিয়ায় সবার শীর্ষে রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে শ্রীলঙ্কা ৩৬৯ ডলার, ভারত ২৬৭ ডলার, পাকিস্তান ১২৯ ডলার ব্যয় করে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ সবচেয়ে কম ব্যয় করে। মাথাপিছু ব্যয় মাত্র ৮৮ ডলার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী দেশের মোট বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ হতে হবে স্বাস্থ্য বাজেট। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেট অনেক কম। জিডিপির এক শতাংশের নিচে। বিশ্বে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ ব্যয় করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সুইজারল্যান্ড ১২ দশমিক ২ শতাংশ এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা জার্মানি ১১ দশমিক ২ শতাংশ ব্যয় করে। জিডিপির তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম ব্যয় করে যথাক্রমে মোনাকো, পাপুয়া নিউগিনি ও ব্রুনাই। এই তিন দেশেরও পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এই দুই দেশের নাগরিকরা নিজেরাই স্বাস্থ্যসেবা খরচের ৭০ শতাংশের বেশি জোগায়।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতেই হবে :বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, প্রতিবছর বাজেটের সময় আমরা স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে আসছি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য জনবলের মানদণ্ড অনুযায়ী বিন্যাসের কথাও বলে আসছি; কিন্তু সরকার তা কখনোই আমলে নেয়নি। এবার করোনা পরিস্থিতি স্বাস্থ্য খাতের ভগ্নদশা আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে। এর পরও সরকার স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব না দিলে বুঝতে হবে, তারা মানুষের জীবন নিয়ে তামাশা করছে।
বিএমএ মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্য খাতকে বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এর সঙ্গে পুরো জাতির ভাগ্য জড়িত। বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে আমূল সংস্কার করতে হবে। কারণ বছরের পর বছর ধরে এই খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি দানা বেঁধেছে। সর্বত্রই শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই করোনা দুর্যোগেও কেনাকাটা নিয়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সিন্ডিকেটগুলো দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিম্নমানের পিপিই ও মাস্ক সরবরাহ করে ওই চক্রটি হাজার হাজার চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর জীবন হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য খাতকে জনবান্ধব করতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্য খাতের পুরো বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সরাসরি মনিটর করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সারাদেশে জেলা শহরে আইসিইউ চালুর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং স্বাস্থ্য খাতে কী পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন হবে, তা প্রধানমন্ত্রী ভালো করেই জানেন এবং সে অনুযায়ী করণীয় নির্ধারণ করবেন বলে জানান তিনি।