বেগম রোকেয়া দিবস আজ
বাড়ছে বাল্যবিয়ে, স্বপ্ন ভূলুণ্ঠিত
বেগম রোকেয়া
সাজিদা ইসলাম পারুল
প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪ | ০০:২৭ | আপডেট: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪ | ০৭:২৯
রংপুরের বাহাদুরপুর গ্রামের সহোদরা জয়গন ও হাসনা বানুর বাল্যবিয়ের গল্প রয়েছে চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের বইয়ে। সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত মোনাজাতউদ্দিন বারবার খবরের কাগজে তুলে এনেছেন এ এলাকার বাল্যবিয়ে, যৌতুক, অসম বিয়ে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির চালচিত্র। সেসব প্রতিবেদন পরে স্থান পেয়েছে তাঁর ‘পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ’ বইটিতে। যৌতুক দিতে না পারায় প্রথম বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল জয়গন ও হাসনার। পরে দুই বৃদ্ধের সঙ্গে বিয়ে হয় দুই বোনের। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্মভূমি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ছাড়াও উত্তরবঙ্গে বহুকাল ধরে চলছে বাল্যবিয়ের এসব ঘটনা।
এমন পরিস্থিতে আজ সোমবার ৯ ডিসেম্বর দেশব্যাপী পালন করা হবে ‘বেগম রোকেয়া দিবস’। ১৮৮০ সালের এই দিনে পায়রাবন্দে জন্ম নিয়েছিলেন এই মহীয়সী। মাত্র ৫২ বছর বয়সে ১৯৩২ সালের এই দিনেই পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন তিনি। ‘বেগম রোকেয়া দিবস’ ও ‘বেগম রোকেয়া পদক প্রদান’ উপলক্ষে গতকাল বাণী দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত, নির্যাতিত ও অসহায় নারীদের অবস্থার উন্নয়নে কাজ করে বেগম রোকেয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে তিনি নারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
রংপুরে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনের নেতারা জানান, রংপুর বিভাগে বাল্যবিয়ের হার ৬৮ শতাংশ, যা দেশের জাতীয় গড়ের বেশি। শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিয়ে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। দারিদ্র্য, সংস্কৃতির অপচর্চা, কমিউনিটি ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকরী যোগসূত্রের অভাব, ভৌগোলিক অবস্থান, নিরাপত্তাজনিত কারণ এবং সামাজিক সচেতনতার অভাবে এই অঞ্চলে বাল্যবিয়ে কমছে না।
আরডিআরএস বাংলাদেশের জননী প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, দেশে বাল্যবিয়ের হার ৫০ ভাগ হলেও রংপুর বিভাগে ৬৮ ভাগ। বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাল্যবিয়ে হয় রংপুর ও লালমনিরহাট জেলায়। রংপুরে ৫৩ দশমিক ৮ ভাগ আর লালমনিরহাটে ৫২ দশমিক ৬ ভাগ।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ও লবণাক্ততার আগ্রাসনে উপকূলীয় অঞ্চলে বাল্যবিয়ের হার বাড়ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচি ২৭ জেলার প্রায় ৫০ হাজার খানায় জরিপ চালায়। যেখানে ৬০ শতাংশের বেশি পরিবারে বাল্যবিয়ের চর্চা রয়েছে বলে উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়, বাল্যবিয়ের শিকার মেয়েদের ৬ দশমিক ৯ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের নিচে।
জলবায়ুর প্রভাবে সাতক্ষীরা জেলাতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই কন্যাশিশু লেখাপড়া থেকে ছিটকে পড়ে। চলতি বছর এই জেলার আলীপুর আজিজিয়া দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণিতে একজন মেয়েও নেই। পার্শ্ববর্তী আরেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাহমুদপুর গার্লস কলেজিয়েট স্কুলের দশম শ্রেণিতে ছাত্রীর সংখ্যা মাত্র ১০ জন। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শেষ প্রান্তে আলীপুর ইউনিয়নের আলীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৫০ ছাত্রীই বাল্যবিয়ের শিকার। সাতক্ষীরার স্থানীয় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কমিটির সদস্য শরীফুল ইসলাম বলেন, লবণাক্ততার কারণে বেশির ভাগ অভিভাবক বয়স হওয়ার আগেই মেয়েকে বিয়ে দেন।
সাতক্ষীরা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ৫০৪টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে ১৮৪টি, ২০২৩ সালে ২৪৫ ও চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ৭৫টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। তবে বন্ধ বিয়েগুলোর বেশির ভাগই পরবর্তী সময়ে অন্য এলাকায় নিয়ে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া বাল্যবিয়েপ্রবণ রংপুর, কুড়িগ্রাম, সাতক্ষীরা ও পিরোজপুর জেলায় নকল ভলিউম বইয়ের মাধ্যমে বেশি বিয়ে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সভাপতি ডা. ফাওজিয়া মোসলেম বলেন, বাল্যবিয়ে মেয়েদের জীবনটাকে বিকশিত হতে বাধাগ্রস্ত করে। অভিভাবকদের দায়িত্ব সন্তানদের বিকশিত হতে সাহায্য করা। মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ মনে করেন, বাল্যবিয়ে একটি বড় অভিশাপ। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের বিধান যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। বাল্যবিয়ে রুখতে নারী নির্যাতন ও বাল্যবিয়ের তথ্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে।
- বিষয় :
- বেগম রোকেয়া দিবস
