ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বেগম রোকেয়া দিবস আজ

মহীয়সীর জন্মভিটায় কাটেনি অন্ধকার

দেহাবশেষ দেশে এনে সমাহিত করার দাবি

মহীয়সীর জন্মভিটায় কাটেনি অন্ধকার
×

রংপুরের পায়রাবন্দে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে বেগম রোকেয়ার জন্মভিটা। রোববার তোলা সমকাল

 স্বপন চৌধুরী, রংপুর ও হাবিবুর রহমান, মিঠাপুকুর

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪ | ০০:২৯ | আপডেট: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪ | ০৬:১৩

ব্রিটিশ ভারতে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মান্ধ পরিবেশে নারী স্বাধীনতার অন্যতম আলোকবর্তিকা বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। পুরুষতান্ত্রিকতার শিকল ভাঙার মানসে অবিভক্ত বাংলায় তিনিই প্রথম নারী শিক্ষার পক্ষে শক্ত লেখনী ধরেছিলেন। যুক্তির মাধ্যমে বুঝিয়েছিলেন, কেন পুরুষের পাশাপাশি সমাজ গঠনে নারীদেরও ভূমিকা রাখা জরুরি। তাই তো তাঁর লেখা পড়ে আজও নারীরা আলোড়িত ও আন্দোলিত হন। প্রেরণা পান নতুনভাবে বেঁচে ওঠার, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। আজ ৯ ডিসেম্বর সেই মহীয়সী বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুদিন। দিনটি পালন করা হয় রোকেয়া দিবস হিসেবে। দিবসটি ঘিরে রংপুরে নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। তাঁর জন্মস্থান রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় রয়েছে পুষ্পমাল্য অর্পণ, পায়রাবন্দ জামে মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, রোকেয়া মেলা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। 

প্রতিবছরই রোকেয়া দিবস এলে রংপুরসহ নানা স্থানে বেগম রোকেয়াকে স্মরণ করার হিড়িক পড়ে যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, এখনও পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়ার জন্মভিটা যেন অন্ধকারে নিমজ্জিত। সেখানে আছে তাঁর স্বজন ও পৈতৃক জমিদারি সম্পত্তি, আঁতুড়ঘর ও বাবা-চাচার কবর। কিন্তু রোকেয়ার সমাধি নেই এখানে। তাই নতুন করে দাবি উঠেছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার সোদপুর থেকে বেগম রোকেয়ার দেহাবশেষ পায়রাবন্দে এনে সমাহিত করা হোক। পাশাপাশি বেগম রোকেয়ার নামে পায়রাবন্দে চালু হোক স্মৃতিকেন্দ্র। দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার হোক এই মহিয়সীর পৈতৃক সম্পত্তি, চালু হোক ১০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল। 

পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়ার জন্মভিটায় ঘুরে দেখা যায়, প্রধান প্রবেশদ্বার পেরিয়ে সামনে হাঁটার সময় বাঁ দিকে চোখে পড়ে কয়েকটি ভবন। সেগুলো পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। এর মধ্যে রয়েছে মানসম্মত একটি রেস্টহাউস, অডিটরিয়াম, সেমিনার কক্ষ, লাইব্রেরি, গবেষণাগার, সংগ্রহশালা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, নামাজ ঘর ও স্টাফ কোয়ার্টার। মূল ভবনের সামনে রয়েছে পিতলের তৈরি বেগম রোকেয়ার একটি ভাস্কর্য। পায়রাবন্দে ১০ শয্যাবিশিষ্ট একটি আধুনিক মানের হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতালটি নির্মাণ করলেও এখনও তা চালু হয়নি। আর একটু সামনে এগুলেই চোখে পড়ে আঁতুরঘরের ধ্বংসাবশেষ। 

জানা গেছে, নানা ক্ষোভ রয়েছে এখনও জীবিত থাকা বেগম রোকেয়ার পরিবারের সদস্যদের। কারণ রোকেয়ার মৃত্যুর ৯১ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তাঁর বসতভিটার সাড়ে ৩০০ বিঘা জমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। দখলকারীদের কোনো তালিকাও নেই স্থানীয় প্রশাসনের কাছে। রোকেয়ার বৈমাত্রেয় ভাই মছিহুজ্জামান সাবেরের তিন ছেলে-মেয়ে এখনও জীবিত। তাঁরা হলেন রনজিনা সাবের, রজিউদ্দিন সাবের ও রেহেনা সাবের। অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক রনজিনা সাবের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রোকেয়া দিবস এলেই শুধু সংবাদকর্মীরা তাঁর খোঁজ নিতে বাড়িতে আসেন। এরপর সারা বছর খবর থাকে না। ৩০ শতক জমির ওপর বেগম রোকেয়ার আঁতুরঘর, যা তাদের পৈতৃক সম্পত্তি। কিন্তু প্রশাসন অধিগ্রহণ না করেই সেখানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে। 

রনজিনা সাবেরের দাবি, সরকার তাদের ওই জমিটুকু অধিগ্রহণ করুক, নয়তো রোকেয়ার পরিবারকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। দুঃখপ্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘রংপুরে বেগম রোকেয়ার নামে বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষিত হয়েও রোকেয়ার পরিবারের কারো চাকরি হয়নি ওসব প্রতিষ্ঠানে। আমার ছেলে ২০১৩ সালে মাস্টার্স পাস করে বর্তমানে কৃষিকাজ করছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধরনা দিয়েও চাকরি মেলেনি।’ বেগম রোকেয়া মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন রনজিনা সাবের। ২০১৩ সালে অবসরে যান। স্বামীসহ দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে পায়রাবন্দের বাড়িতেই এখন থাকছেন তিনি।

রনজিনা সাবের আরও জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে পায়রাবন্দের রোকেয়া মেলায় বেগম রোকেয়ার দেহাবশেষ এনে বাবার কবরের পাশে সমাহিত করার দাবি তুলেছিল পরিবার। তৎকালীন জেলা প্রশাসক বি এম এনামুল হক সে দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে ২০১০ সালে রোকেয়ার পরিবার ও স্থানীয়দের বিভিন্ন দাবি সংবলিত একটি লিখিত আবেদন সংস্কৃতি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠান। কিন্তু আজও সেই দাবি চিঠি চালাচালিতে চাপা পড়ে আছে। 

শুধু দিবসভিত্তিক বেগম রোকেয়াকে স্মরণ না করে তাঁর সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ ও প্রকাশ করে স্মৃতিকেন্দ্রে রাখার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল। তিনি বলেন, বেগম রোকেয়ার দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনা উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হবে। স্মৃতিকেন্দ্র চালুসহ অন্য সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

আরও পড়ুন

×