মেডিকেলে শিক্ষক সংকট, বঞ্চিত উপযুক্তরা

ছবি: সংগৃহীত
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৫ | ০১:১৯ | আপডেট: ১২ মার্চ ২০২৫ | ১০:৫৯
দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে চলছে শিক্ষক সংকট। গত ১৬ বছরে ২২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ অনুমোদন পেয়েছে। শিক্ষক পদ সৃষ্টি ছাড়া এসব কলেজ গড়ে ওঠায় সংকট বেড়েছে। চাহিদার ৫৭ শতাংশ শিক্ষক দিয়ে চলছে মেডিকেল শিক্ষা। এতে ব্যাহত হচ্ছে একাডেমিক কার্যক্রম। এদিকে শিক্ষক সংকটের কারণে দেশীয় এমবিবিএস ডিগ্রির বহির্বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যোগ্যতা থাকলেও পদোন্নতি আটকে আছে সাড়ে সাত হাজার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলছেন, শিক্ষক নিয়োগে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে সংকট কাটিয়ে উঠতে আরও পাঁচ-সাত বছর লাগবে। একই সঙ্গে সংকটাপন্ন ১৪টি মেডিকেল কলেজ মানোন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) তথ্য বলছে, সারাদেশে সরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে ৩৭টি। এসব মেডিকেলে শিক্ষকের পদ আছে ৬ হাজার ৪৪৬টি। বর্তমানে ৩ হাজার ৭০০ জন শিক্ষক দিয়ে চলছে মেডিকেলের শিক্ষা কার্যক্রম। বাকি ২ হাজার ৭৪৬টি পদ ফাঁকা। অর্থাৎ ৪২ দশমিক ৬০ শতাংশ পদ খালি। সবচেয়ে বেশি খালি অধ্যাপক পদ, ৬৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ৮৭৭টি পদের মধ্যে ৫৬৭টি পদ শূন্য। ১ হাজার ৬৩৪টি সহকারী অধ্যাপক পদে শিক্ষক রয়েছেন ৭৩৫টি। ২ হাজার ৪৫৩টি সহযোগী অধ্যাপক পদের মধ্যে ১ হাজার ২৫০টি শূন্য। এ ছাড়া ৬২টি কিউরেটরের পদের মধ্যে ১২টি, ১ হাজার ২৪০টি প্রভাষক পদের মধ্যে ১৮২টি শূন্য।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেডিকেল শিক্ষার প্রসার ঘটাতে আওয়ামী লীগ আমলে জেলায় জেলায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। শিক্ষার মান না বাড়িয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হয়। এগুলোতে অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। ৩৭টির মধ্যে অনেক মেডিকেল কলেজের সঙ্গে হাসপাতাল নেই। এসব সংকটের কারণে সরকারি মেডিকেল থেকে অদক্ষ ডাক্তার বের হচ্ছে। অভিজ্ঞ শিক্ষক নেই, ল্যাবরেটরি নেই, হাতেকলমে শেখার ব্যবস্থা নেই– এ রকম স্বল্পতা নিয়ে সরকারি মেডিকেল চলছে বছরের পর বছর।
চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি এবং স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন-সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, মেডিকেল কলেজের শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিন ধরে। এটির সমাধান জরুরি। শিক্ষক সংকট থাকলে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা পায় না, দক্ষ হয়ে ওঠে না। তাহলে তো ভালো ডাক্তার তৈরি হবে না। দক্ষ ডাক্তার তৈরি না হলে রোগীরা ভুগবে।
ভয়াবহ শিক্ষক সংকট শেরেবাংলা মেডিকেলে
বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে ৩৪৩টি শিক্ষক পদের বিপরীতে ২০৬টি ফাঁকা। এর পর সংকট সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে ৩৫৪ পদের খালি ১৭২টি। সবচেয়ে কম সংকট মুগদা মেডিকেল কলেজে, ১১৭ শিক্ষক পদের খালি ২৩টি।
১৪ মেডিকেল কলেজে মানোন্নয়নে গুরুত্ব
অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকট নিয়ে নতুন গড়ে ওঠা ছয় মেডিকেল কলেজ বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। তবে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের বাধায় সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর। সর্বশেষ গড়ে ওঠা ৬টি মেডিকেল কলেজ ও পুরোনো আট মেডিকেল কলেজের মানোন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণসহ ল্যাব ও হাসপাতাল সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হবিগঞ্জ, নীলফামারী, নেত্রকোনা, মাগুরা, নওগাঁসহ পুরোনো আট মেডিকেলের মানোন্নয়নে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষার অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেন সমকালকে বলেন, ৩৭টি মেডিকেলের মধ্যে ১৪টির অবস্থা সংকটাপন্ন। তাদের ক্রটিগুলো চিহ্নিত করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলসহ পাঁচ মেডিকেল কলেজে নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ১৯টি মেডিকেল কলেজে হোটেল নির্মাণ করা হবে। সব মিলিয়ে আমরা মেডিকেল শিক্ষার মানে জোর দিচ্ছি।
নতুন শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অধ্যাপক অবসরের পর নতুন করে অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ সহকারী বা সহযোগী অধ্যাপক পদোন্নতি পাচ্ছেন না। শিক্ষক পদোন্নতির জন্য দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ডিপিসি (বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি) করতে হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে এটা আটকে রয়েছে।
যোগ্যতা থাকলেও বঞ্চিত
সব মেডিকেল কলেজে ৪৩ শতাংশ শিক্ষক সংকট রয়েছে। অন্যদিকে যোগ্য সাড়ে ৭ হাজার শিক্ষকের পদোন্নতি আটকে রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত ৪-৫ বছর ধরে এ শিক্ষকদের ঘোরাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পরও একাধিকবার বৈঠক করে কোনো সমাধান হয়নি।
বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ফোরামের আহ্বায়ক ডা. মির্জা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষক সংকটের কারণে বহির্বিশ্বে দেশের এমবিবিএস ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সমাধান না হলে আগামী জুনের পর তা বাতিল হতে পারে। এর মূল কারণ গত আওয়ামী লীগের আমলে নতুন করে ২৩টি মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলা হয়েছে শিক্ষকদের পদ সৃষ্টি না করে। এর জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দায়ী। শিক্ষক সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুটি পদক্ষেপ নিতে পারে। একটি সুপারনিউমারারিভাবে অতিদ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া। নতুন সৃষ্টি হওয়া মেডিকেল পদ সৃষ্টি করা। এটি করতে সরকারের দুই থেকে তিন বছর সময় লেগে যাবে।
যা বলছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান সমকালকে বলেন, মৌলিক আট বিষয়ে শিক্ষক সংকট সবচেয়ে বেশি। গাইনি, কার্ডিওলজির মতো ক্লিনিক্যাল সাবজেক্টে শিক্ষক সংকট নেই। মৌলিক বিষয়ে প্র্যাকটিসের সুযোগ কম থাকায় এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষা নেওয়ার হার কম। তবে আমরা মৌলিক বিষয়ে যাতে শিক্ষক তৈরি হয়, সে জন্য উদ্যোগ নিচ্ছি। তবে ফলাফল পেতে ৫-৭ বছর সময় লাগবে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষক বা অবকাঠামো সংকটের কারণে সরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে মানহীন ডাক্তার তৈরি হবে, সেটা দুঃখজনক। আমরা মেডিকেল শিক্ষার মান উন্নয়নে চেষ্টা করছি।