সমাজ
সন্তানদের সফল হতে শেখাচ্ছি, কিন্তু মানবিকতা কতদূর
যে সমাজ বৃদ্ধদের সম্মান দিতে পারে না, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেও সম্মান দিতে শেখে না।
সুলতান মাহমুদ রানা
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ১৯:৪৫
রাজধানীর মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম নামের এক বৃদ্ধা মায়ের মরদেহ সাত দিন ধরে পড়ে ছিল। মৃত্যুর পরও কেউ খোঁজ নেয়নি। ঘটনাটি আমাদের সমাজের সামনে একটি নৈতিক ও মানবিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। একজন বৃদ্ধা নারী মৃত্যুর পর সাত থেকে আট দিন ধরে একটি কক্ষে পড়ে ছিলেন, অথচ বিষয়টি কারও নজরে আসেনি। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো তাঁর সন্তানরা সমাজে অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত। তাদের মধ্যে একজন যুগ্ম সচিব, একজন বুয়েট শিক্ষক, আরেকজন বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। পরিবারের অন্য সদস্যরাও উচ্চশিক্ষিত ও সম্মানজনক পেশায় যুক্ত।
ঘটনাটি আমাদের এমন এক সামাজিক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে, যা নিয়ে আলোচনা জরুরি। অনেক মানুষের কাছেই এটি মেনে নেওয়া কঠিন। বিশেষ করে যখন জানা যায়, পরিবারের সদস্যরা শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত এবং সম্মানজনক পেশায় আছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কীভাবে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হলো? তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত নৈতিক বা আইনি সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে পুরো ঘটনা জানা দরকার। সংবাদে যা এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে বৃদ্ধা তাঁর মেয়ের বাসায় থাকতেন এবং মৃত্যুর কারণ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে এখনও তদন্ত চলছে। তাই কেবল পেশাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা ন্যায়সংগত হবে না। কিন্তু বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নটি অবশ্যই বৈধ।
সমাজ সাধারণত মনে করে, একজন যুগ্ম সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা অন্য কোনো উচ্চপদস্থ পেশাজীবী কেবল দক্ষ পেশাজীবীই নন, তিনি একজন দায়িত্বশীল নাগরিকও। কারণ শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা মানুষের মধ্যে অধিকতর সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতা সৃষ্টি করবে– এটাই প্রত্যাশা।
তাই যখন কোনো বৃদ্ধ মা বা বাবা চরম অবহেলা, নিঃসঙ্গতা বা অযত্নের শিকার হন এবং তাদের সন্তানরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত বলে পরিচিত হন, তখন মানুষের বিস্মিত হওয়া স্বাভাবিক। কারণ এটি আমাদের সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যে শিক্ষা ও সাফল্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানবিকতা নিশ্চিত করে।
আসলে এই ঘটনা হয়তো আরও বড় একটি সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে: আমরা সন্তানদের সফল হতে শেখাচ্ছি, কিন্তু সবসময় মানবিক হতে শেখাতে পারছি না। একটি ডিগ্রি মানুষকে দক্ষ করে, একটি পদ তাঁকে ক্ষমতা দেয়, একটি বেতন তাকে সচ্ছলতা দেয়; কিন্তু এগুলোর কোনোটিই নিশ্চিত করে না যে সে একজন যত্নশীল ছেলে, মেয়ে বা পরিবারের সদস্য হবে।
তাই আমাদের সামনে প্রশ্ন আসে আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করছি, যেখানে পেশাগত সাফল্যকে মানবিক দায়িত্বের চেয়ে বেশি মূল্য দেওয়া হচ্ছে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের সংকটেরও প্রতিচ্ছবি।
আধুনিক সমাজে আমরা সাফল্যের সংজ্ঞা তৈরি করেছি শিক্ষা, চাকরি, পদমর্যাদা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সামাজিক মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে। সন্তান একজন বড় কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা বিদেশে প্রতিষ্ঠিত– এগুলোকে আমরা অভিভাবকের জীবনের সর্বোচ্চ অর্জন হিসেবে দেখি।
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার আধুনিক সভ্যতাকে লোহার খাঁচার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তাঁর মতে, আধুনিক মানুষ দক্ষতা ও সাফল্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে এমন এক কাঠামোর মধ্যে আটকে যায়, যেখানে আবেগ, সম্পর্ক ও মানবিকতার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। আজকের নগরজীবন যেন সেই তত্ত্বের বাস্তব উদাহরণ। আমরা কর্মজীবনে যত উন্নত হচ্ছি, সম্পর্কের ক্ষেত্রে তত দরিদ্র হয়ে পড়ছি।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম দেখিয়েছেন যে, সমাজে যখন পারস্পরিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়, তখন মানুষ গভীর বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়। চারপাশে মানুষ থাকলেও মানুষ একা হয়ে পড়ে। আজকের শহুরে জীবনে একই বাড়িতে থেকেও মানুষ আলাদা জগতে বাস করে। একই ছাদের নিচে থেকেও একজন বৃদ্ধা মা হয়তো দিন, সপ্তাহ কিংবা মাসের পর মাস মানসিকভাবে নিঃসঙ্গ থাকেন।
উল্লিখিত ঘটনাটি আমাদের আরেকটি কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয়। প্রযুক্তি মানুষের যোগাযোগ সহজ করেছে, কিন্তু সম্পর্ক সবসময় গভীর করেনি। আজ আমরা দিনে শত শত মানুষের পোস্ট দেখি, অসংখ্য বার্তা আদান-প্রদান করি, কিন্তু অনেক সময় নিজের পরিবারের একজন বৃদ্ধ সদস্য কেমন আছেন, সেটি জানার সময় বের করতে পারি না। ডিজিটাল সংযোগ বাড়ছে, কিন্তু মানবিক সংযোগ কমছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আমরা ধীরে ধীরে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করছি যেখানে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে তার উৎপাদনশীলতা দিয়ে। একজন ব্যক্তি যতদিন কর্মক্ষম, ততদিন তিনি গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি যেন পরিবারের কেন্দ্র থেকে প্রান্তে সরে যান। অথচ যে মা বা বাবা একসময় পরিবারের ভিত্তি ছিলেন, তারাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অনেক সময় সবচেয়ে বেশি একা হয়ে পড়েন।
নূরজাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, উচ্চ বেতন, বিদেশি ডিগ্রি কিংবা সামাজিক মর্যাদা কোনো সমাজকে মানবিক করে তোলে না। একটি সমাজের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় সে তার সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে নির্ভরশীল এবং সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তার মাধ্যমে।
আমরা হয়তো উন্নয়নের নতুন নতুন সূচকে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু যদি কোনো বৃদ্ধা মা মৃত্যুর পর এক সপ্তাহ ধরে অযত্নে পড়ে থাকেন, যদি তাঁর নিঃসঙ্গতার খবর আমাদের কাছে পৌঁছায় কেবল দুর্গন্ধের মাধ্যমে, তাহলে আমাদের উন্নয়নের গল্পের মধ্যে কোথাও না কোথাও একটি শূন্যতা রয়ে গেছে।
এই ঘটনাটি নিঃসন্দেহে ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্র– সবার জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ যে সমাজ বৃদ্ধদের সম্মান দিতে পারে না, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেও সম্মান দিতে শেখে না।
প্রশ্নটি তাই শুধু নূরজাহান বেগমের নয়। প্রশ্নটি আমাদের সবার– আমরা কি সত্যিই মানুষ হচ্ছি, নাকি শুধু সফল হচ্ছি?
ড. সুলতান মাহমুদ রানা: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- সমাজ
- বৃদ্ধের মৃত্যু
