ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

ইরান যুদ্ধে প্রভাবে ফিলিপাইনের মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ

ইরান যুদ্ধে প্রভাবে ফিলিপাইনের মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ
×

নাধেরা মোহাম্মদ কাসেম

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ১৯:৩৩

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘটনা বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তেল, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সাধারণত এই প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে এসব পণ্য সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় অর্থনীতি হয়ে পড়েছে স্থবির।
ফলে ফিলিপাইনই প্রথম দেশ হিসেবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে, কিন্তু তাতে ঘাটতি মেটাতে তেমন কোনো লাভ হয়নি। দামবৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশটিতে বারবার বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু আর্থসামাজিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এই সংঘাত দেশের মুসলিম সম্প্রদায়কেও প্রভাবিত করেছে, বিশেষ করে বাংসামোরো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে। এটি স্থানীয় ইসলামী পণ্ডিতদের মধ্যে বিভেদ আরও গভীর করেছে, যা সামাজিক সংহতির জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যম ও জনপরিসরে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রধানত, দুটি পক্ষ তৈরি হয়। একটি পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টিকে সমর্থন করে। উদাহরণস্বরূপ, মুসলিম সম্প্রদায়ের একজন সদস্য সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে লেখেন, ইরানের শক্তি ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে গাজার জন্য মুসলমানদের প্রার্থনা কবুল হচ্ছে। আরেকজন লিখেছেন, মুসলমানদের ভেঙে যাওয়া সম্মান ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারে তেহরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

অপর পক্ষটি ইরানের বিরোধিতা করে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, এটি একটি শিয়া রাষ্ট্র এবং সেই কারণে সুন্নি সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের বৈরী মনোভাব রয়েছে। এই পক্ষের একজন আলেম এই মত দেন, শিয়ারা জায়নবাদীদের সমতুল্য; তিনি শিয়ারা সূক্ষ্ম শত্রু এবং জায়নবাদীরা দৃশ্যমান শত্রু হিসেবে বর্ণনা করেন।
বাংসামোরোর ইসলামী পণ্ডিতদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত এই সংঘাত নতুন কিছু নয়। আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল ও বেশ কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর বিভাজনের একটি ক্রমবর্ধমান দৃশ্যমান ধারা সামনে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি নিয়ে এমন মতবিরোধ আগে কখনও দেখা যায়নি। ফলে ফিলিস্তিন ইস্যুতেও সৃষ্টি হয়েছে বিভাজন।

এখানে উল্লেখ্য, ফিলিস্তিনের প্রতি ফিলিপাইনের সংহতির এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ে মুসলিম ও অমুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কর্মীরা নিয়মিতভাবে বিক্ষোভের আয়োজন করে আসছে।

তবে, স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ার পর কয়েকজন বাংসামোরো পণ্ডিতের পক্ষ থেকে অকল্পনীয় কিছু বিবৃতি চোখে পড়ে, যেখানে তারা ফিলিস্তিনের জন্য আন্দোলনকে ইরানি চক্রান্ত হিসেবে তুলে ধরেন। তাদের যুক্তি হলো, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন ইরানের মিত্র। আর এ কারণে তারা পথভ্রষ্ট ও শিয়া শক্তির একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস যখন ইসরায়েলের ওপর হামলা চালায়, তখন ভাবাদর্শের সংঘাত আরও গভীর হয়। কিছু পণ্ডিত পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম এবং জায়নবাদপন্থি বয়ানের প্রতিধ্বনি দেন। তারা এই হামলাকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং ইসরায়েলের ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বারা ফিলিস্তিনিদের ওপর কয়েক দশকের নিপীড়ন উপেক্ষা করেন। অন্যদিকে, অপর পক্ষ ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে সমর্থন দেয়। যদিও ইসলামী পণ্ডিতগণ এই বয়ানগত দ্বন্দ্বে জড়িত, তবে এটি নিছক কোনো ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক নয়, বরং রাজনীতি ও ধর্মের জটিল সম্পর্কেরই একটি বহিঃপ্রকাশ।

উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে রাজনীতি ও ধর্ম নানাভাবে জড়িয়ে থাকাটা স্বাভাবিক। তবে বাংসামোরোর প্রেক্ষাপটে বলা যায়, যেখানে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ভঙ্গুর, সেখানে আরব দেশগুলো থেকে বাহ্যিক শক্তি ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোসমূহ স্থানীয় পর্যায়ে ক্রমবর্ধমানভাবে আমদানি করা হচ্ছে।
এর প্রধান কারণ হলো ইরান-বিরোধী অবস্থানকারী কিছু পণ্ডিত নির্দিষ্ট কিছু উপসাগরীয় দেশে শিক্ষিত হয়েছেন। এই গতিপ্রকৃতি স্থানীয় প্রেক্ষাপটকে প্রভাবিত করছে, যা একটি সাধারণ প্রবণতাকেই তুলে ধরে। আর সেটি হলো কর্তৃত্ববাদী ভাবধারার শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থীরা নিজ দেশে ফিরে গিয়ে সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মতাদর্শেরই পুনরুৎপাদন করে। বাংসামোরোর মুসলিম সম্প্রদায়ের উচিত নয় বিভেদ সৃষ্টিকারী বয়ানে প্রভাবিত হওয়া, বরং তাদের উচিত বিশ্বাসকে ইসলাম ও নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা।

নাধেরা মোহাম্মদ কাসেম: ইসলাম ও রাজনীতি বিষয়ক গবেষক; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×