সমকালীন প্রসঙ্গ
পরিবেশসম্মত সবুজ দেশ গঠনের দায়
প্রতীকী ছবি
ফয়সাল কবীর শুভ
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ২২:২৪
৫ জুন– বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই দিবসের গুরুত্ব আরও বেশি। বাংলাদেশ বর্তমানে একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করছে, অন্যদিকে দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও জনসংখ্যার চাপের কারণে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ১ শতাংশেরও কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির বড় অংশ বহন করতে হচ্ছে আমাদের। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, উত্তরাঞ্চলে খরা, নদীভাঙন, তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা এবং নগর জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত বাস্তবতা। এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশ ও জলবায়ু প্রশ্নকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের পরিবেশগত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের একটা অন্যতম জায়গা হলো পানিসম্পদের নিরাপত্তা। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পানীয় ও শিল্পকারখানার পানি আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে ২ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। এই বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প একটি যুগান্তকারী জাতীয় উদ্যোগে পরিণত হতে পারে। গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, নদীর নাব্য রক্ষা, মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিতকরণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, স্বাধীনতার পর পদ্মা সেতুর মতোই পদ্মা ব্যারাজও বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক প্রকল্প হতে পারে।
পানি ব্যবস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার। এক সময় বাংলাদেশের নদী-খালভিত্তিক প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ব্যবস্থা ছিল বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ। কিন্তু গত কয়েক দশকে দখল, ভরাট ও অব্যবস্থাপনার কারণে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল হারিয়ে গেছে। ফলেই ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচিতে প্রায় ২০,০০০ নদী ও কিলোমিটার খাল পুনর্খনন ও পুনরুদ্ধারের যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে। খাল পুনরুদ্ধার শুধু বন্যা ও জলাবদ্ধতা কমাবে না; এটি ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে একটা কথা ভালোভাবে মনে রাখা জরুরি যে, খাল খননে একটা সুপরিকল্পনা ছাড়া এগুলো ভবিষ্যতে উল্টো বিভিন্ন সমস্যার কারণ হয়ে যেতে পারে। তাই বিএনপির ১৯৯১-৯৬ কিংবা ২০০১-২০০৬ খাল খনন কর্মসূচি শুরু হলেও কেন সেই কর্মসূচিগুলো তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি তার একটা পর্যালোচনা করা উচিত এবং তার আলোকে দেশব্যাপী সুনির্দিষ্ট ‘নেটওয়ার্ক’ ধরে খাল ও নদী খননের পরিকল্পনাপূর্বক বাস্তবায়ন করা উচিত হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বিভাগ, সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় সরকার এবং দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তাই একটা সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে এই রকম পরিকল্পনা নেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোতে পানি পুনর্ব্যবহার ও জল সংরক্ষণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার পানি পুনর্ব্যবহার কর্মসূচি দেখিয়েছে যে, প্রযুক্তি ও জনসচেতনতার সমন্বয়ে পুনর্ব্যবহৃত পানি নিরাপদভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। বাংলাদেশের নতুন আবাসন প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্রেহওয়াটার রিসাইক্লিং এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী ও অপচয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে ভবিষ্যতে প্রজন্মকে তৈরি করার জন্য প্রাথমিক শিক্ষার কারিকুলামে নগরায়ণ, পরিবেশ সুরক্ষা ও পানি সংরক্ষণের ব্যাপার সুচারুভাবে অন্তর্ভুক্ত করা খুবই জরুরি।
পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি আরেকটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। বিএনপির ঘোষিত ২০২৬-২০৩১ মেয়াদে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিতে পরিণত হবে। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, একটি পূর্ণ বয়স্ক গাছ বছরে গড়ে ২০ থেকে ২৫ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে। সে হিসেবে কোটি কোটি গাছ দীর্ঘমেয়াদে কার্বন শোষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, মাটির ক্ষয়রোধ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, বৃক্ষরোপণের চেয়ে গাছ টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। তাই ডিজিটাল মনিটরিং, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং অন্তত পাঁচ বছরের রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে অবহেলিত ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। দেশের শহরগুলো প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার টনেরও বেশি কঠিন বর্জ্য উৎপাদন করে, যার বড় অংশ উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হয়। সদ্য গঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের মতো বিভিন্ন বড় জেলা শহরে এখনও পৌর বর্জ্য মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। ফলে মিথেন গ্যাস নিঃসরণ, পানিদূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে। এই অবস্থায় জেলাভিত্তিক বর্জ্য পৃথক্করণ, কম্পোস্ট উৎপাদন এবং সার্কুলার ইকোনমি গড়ে তোলা সময়ের দাবি। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে পারলে একদিকে পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্যদিকে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও বাংলাদেশ একটি নতুন দিগন্তের দিকে এগোচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস ও আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এই বাস্তবতায় সরকার সৌর, বায়ু এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি করেছে এবং ধাপে ধাপে জ্বালানি খাতকে আরও টেকসই করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না; প্রয়োজন বিনিয়োগবান্ধব নীতি, আধুনিক গ্রিড অবকাঠামো, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ। কারণ একটি সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি শুধু পরিবেশগত প্রয়োজনই নয়, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতারও অন্যতম ভিত্তি।
বাংলাদেশের পরিবেশ ও জলবায়ু নীতি দীর্ঘদিন ধরে প্রকৌশল, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এখন একটি আন্তঃখাতীয় সমস্যা, যার সমাধানে বিজ্ঞান, অর্থনীতি, পরিকল্পনা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক আচরণগত পরিবর্তনের সমন্বয় প্রয়োজন। আশার ব্যাপার হলো, প্রধানমন্ত্রী নিজেই পরিবেশ সুরক্ষার ব্যাপারে বেশ সচেতন।
সাম্প্রতিক সময়ে বর্তমান সরকারের কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আশাব্যঞ্জক বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, জলবায়ু ও পানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী নিয়োগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একইভাবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবেও যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ জাতিসংঘের ১৭টি এসডিজির মধ্যে অন্তত ১১টি লক্ষ্য সরাসরি পরিবেশ ও জলবায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত। নিরাপদ পানি, টেকসই নগরায়ণ, জলবায়ু পদক্ষেপ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, দায়িত্বশীল উৎপাদন ও ভোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি– এসব লক্ষ্য অর্জন ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রা পূর্ণতা পাবে না।
সব শেষে মনে রাখতে হবে, পরিবেশ সংরক্ষণ কেবল সরকারের কাজ নয়। নাগরিক, স্থানীয় সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক দল– সবাইকে এই যাত্রায় অংশ নিতে হবে। প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ, গাছ লাগানো ও পরিচর্যা, খাল-নদী দখল প্রতিরোধ এবং বর্জ্য পৃথক্করণের মতো ছোট ছোট উদ্যোগও জাতীয় পর্যায়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো– পরিবেশ ও উন্নয়নকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে। পদ্মা ব্যারাজ, খাল পুনরুদ্ধার, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি পুনর্ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দক্ষ পরিবেশ নেতৃত্বের সমন্বয়ে বাংলাদেশ একটি সবুজ, জলবায়ু-সহনশীল এবং টেকসই রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। আজকের অঙ্গীকার হোক– শুধু বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন নয়, বরং পরিবেশকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
লেখক অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী পরিবেশ গবেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদ, সিডনি ওয়াটারে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের একজন ফেলো সদস্য
- বিষয় :
- পরিবেশ
- জলবায়ু
- সবুজ প্রকল্প
