ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ

হুমায়রা-আকলিমারা বাদ পড়ে যাবেন!

হুমায়রা-আকলিমারা বাদ পড়ে যাবেন!
×

সাজিদা ইসলাম পারুল

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

এপ্রিলের মাঝামাঝি একদিন সন্ধ্যায় সৈয়দা জান্নাতুল হুমায়রার মোবাইলে ফোন আসে। তাকে বলা হয় পুরান ঢাকায় গিয়ে একই পরিবারের সবার করোনার নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। ভয়কে তুচ্ছ করে অটোরিকশায় চড়ে সহকর্মী একজনকে নিয়ে ছুটে যান পুরান ঢাকার অলিগলি পেরিয়ে গন্তব্যস্থলে। বহুতল ভবনের সাত তলায় থাকে ওই পরিবার। তবে অন্ধকারে সরু সিঁড়ি মাড়িয়েই সরঞ্জামাদি নিয়ে তাকে উঠতে হবে। আশপাশে দোকানপাট না থাকায় দূরের এক খাবার হোটেল থেকে মোমবাতি সংগ্রহ করে সেই রাতেই করোনা রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট হুমায়রা।
আরেকজন উচ্চতর ডিগ্রিধারী মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আকলিমা আক্তার। দিন নেই, রাত নেই, রোগীর ফোনে ছুটে চলেন রাজধানীর বিভিন্ন অলিগলিতে। রোগীর নমুনা সংগ্রহকারী এই আকলিমা অসংখ্যবার সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হয়েছেন। মার্চের শেষ দিকে কুর্মিটোলা হাসপাতাল মর্গে ছয়টি মৃতদেহের করোনার নমুনা সংগ্রহ করতে যান তিনি। অসংখ্য মৃতদেহের ভিড়ে ওই ছয়টি মৃতদেহ বের করতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লেগেছিল। ভয়ে গা হিম হয়ে গিয়েছিল সেই সময়। একপর্যায়ে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের মৃতদেহ দেখে নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়েছে।
গত মার্চ থেকে এরকম অসংখ্য ঘটনার সাক্ষী রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'আইইডিসিআর'-এ কর্মরত হুমায়রা, আকলিমা, মাইনুল ইসলাম, মোস্তফা কামাল, দ্বিপান্বিতা বিশ্বাস, মাসুদুল হক, ফারুক আজম হিরা, মোহাম্মদ শফিকুল ভূঁইয়া, রাশেদুল ইসলাম, হারুনসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত ৬০ জন উচ্চতর ডিগ্রিধারী মেডিকেল টেকনোলজিস্ট। তারা প্রত্যেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যথাক্রমে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি থেকে বিএসসি সম্পন্ন করেছেন। মৃত্যুভয়কে পেছনে ফেলে তারা করোনা রোগীদের কাছে ছুটে যাচ্ছেন নমুনা সংগ্রহ করতে। এমনকি পরিবার ও সমাজের সবাই যখন করোনায় মৃত ব্যক্তির দেহ ফেলে রেখে চলে যায়, তখনও করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য সারাদেশে চালু করা বিভিন্ন হাসপাতাল ও ল্যাবরেটরিতে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদে প্রথম পর্যায়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে এই ৬০ জনের নিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল সর্বাগ্রে। রাষ্ট্রপতি এক আদেশে ১৮৩ মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে সৃজিত নতুন পদে নিয়মিত নিয়োগ করার সম্মতি দিলেও গত ৯ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. বেলাল হোসেন নির্দিষ্ট প্রার্থীদের তথ্য ও কাগজপত্র জমা দিতে বলেন। গত ১৪ ও ১৫ জুন ছিল ওই কাগজপত্র দাখিলের শেষ দিন। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন এমবিডিসির পরিচালক অধ্যাপক ডা. শামিউল ইসলামের স্বাক্ষরিত তালিকায় নাম না থাকায় তাদের বেশিরভাগেরই কাগজপত্র জমা নেওয়া হয়নি। 'আইইডিসিআর'র দু'জনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় থাকলেও পরে তা বাদ দেওয়া হয়। ফলে চাকরিতে নিয়মিত হওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তারা।
জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার স্বীকৃত ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি থেকে সংশ্নিষ্ট বিষয়ে তিন বছর ডিপ্লোমা পাস চাওয়া হয়। কিন্তু অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) কর্তৃক ২ জুন ১৮৩ জনের নামের প্রস্তুতকৃত তালিকাটি অসঙ্গতিপূর্ণ ও বিধিবহির্ভূত। এ ছাড়া ১৬ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ১৫৭ জন টেকনোলজিস্ট নিয়োগের নির্দেশনা চেয়ে পাঠানো তালিকাটি ত্রুটিপূর্ণ ও বিতর্কিত। এর মধ্যে সরাসরি করোনা নিয়ে কর্মরত 'আইইডিসিআর'-এর টেকনোলজিস্টদেরও এ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ- করোনাযুদ্ধের সম্মুখ যোদ্ধা তারা। অথচ এই পদে উচ্চতর ডিগ্রিধারী হওয়া সত্ত্বেও তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের অনেকেই করোনা পজিটিভ। তারা এখন চোখের জল ফেলছেন।
বিএসসি করাদের বাদ দিয়েই 'মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদে' নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি :সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও এক হাজার ১৭টি পদের জন্য মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এতেও সরাসরি বিএসসি পাস করাদের আবেদন করার সুযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মোস্তফা কামাল জানান, রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহী, রংপুর, ঠাকুরগাঁও গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেছেন তিনি। এমনকি রাতের অন্ধকারেও মর্গে গিয়ে মৃতদেহ থেকে করোনার নমুনা সংগ্রহ করেছেন।
তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, 'নিজের জীবন বাজি রেখে পরিবারের কথা চিন্তা না করে কাজ করেছি। কভিড পজিটিভ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছি। রাষ্ট্রপতির নির্দেশে ১৮৩ জন স্বেচ্ছাসেবককে চাকরি দিলেও আমি একই বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও চাকরি পাইনি। নতুন বিজ্ঞপ্তিতেও 'বিএসসি' অর্জন করায় বঞ্চিত করা হচ্ছে।'
স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি করার জন্য কয়েক বছর আগে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে বিএসসি ইন মেডিকেল টেকনোলজি, ল্যাবরেটরি, রেডিওলজি এবং ফিজিওথেরাপি বিভাগ খোলা হয়। ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ২০১৩ থেকে ২০১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে 'বিএসসি ইন মেডিকেল টেকনোলজি ল্যাব' বিষয়টি খোলা হয়।
নিয়োগ তালিকায় বাদ পড়া বিএসসি মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা অভিযোগ করে বলেন, 'আমরা যারা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান বিষয়ে পাস করে উচ্চতর ডিগ্রি হিসেবে মেডিকেল টেকনোলজিতে বিএসসি করলাম, শুধু ডিপ্লোমা না থাকার কারণে আমরা আজ নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। যদিও আমাদের ডিপ্লোমা ডিগ্রির চেয়েও উচ্চতর বিএসসি ডিগ্রি রয়েছে এবং আমরা অধিকতর দক্ষতাসম্পন্ন।' তারা বলেন, অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও সত্য যে, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাস করা মানহীন মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা আসন্ন নিয়োগে সুযোগ পেলেও যোগ্যতাসম্পন্ন বিএসসি মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. বেলাল হোসেন সমকালকে বলেন, 'নিয়োগবিধিতে যেটা আছে, সেটা অনুসরণ করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আগামীতেও নিয়োগবিধি অনুসরণ করেই নিয়োগ দেওয়া হবে।' তিনি জানান, নিয়োগবিধি অনুযায়ী কোনো স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে তিন বছরের ডিপ্লোমাধারী মেডিকেল টেকনোলজিস্টরাই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে।'
বিএসসি ডিগ্রিধারী মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা নতুন পদ সৃষ্টি করার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন জানালে তাদের আশ্বস্ত করা হয়। তাদের জানানো হয়, নিয়োগবিধি আংশিক সংশোধন করে সরাসরি 'ডিপ্লোমা' কথাটির পরিবর্তন করে সংশ্নিষ্ট বিষয়ে 'নূ্যনতম ডিপ্লোমা' অথবা 'ডিপ্লোমা/বিএসসি' উল্লেখ করে সরাসরি বিএসসি পাস করাদের আবেদন করার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু অধিদপ্তর আশ্বস্ত করলেও এখনও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে ডা. মো. বেলাল হোসেন বলেন, 'পরিবর্তন বা পরিমার্জনের জন্য মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ কমিটি রয়েছে। ওই কমিটিই 'নতুন পদ সৃষ্টি'র বিষয়টি তুলে ধরে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।'

আরও পড়ুন

×